Tuesday, June 28, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস



৪৪.
এ বাসর তো ছায়াপথে প্রাণের প্রলাপ গাইছে,
কোটি কোটি তারায় .... কতকাল ধরে যে, সে কথা ভাবলে, কত স্রোতধারায় ভাসি....!
সে সব যদি ভাবি একবারও , তবে ফিরে যাই অনেক জন্মের শুভ শুচনার মহেন্দ্রক্ষণটির কাছে যেন বারবার ;


তখন কোথাও কোনও
ভাষা নেই 
আছে রাশিরাশি বোজা চোখের একটিই মুখ যেন সে ;


যা এই নিঃশব্দের রাত লক্ষকোটি বছর একান্তে অনুবাদ করে চলেছে যেন কানে কানে .......!





৪৫.
সেদিন অন্ধকারে যে ফুলটি দেখেছিলাম 
ফাগুন-পলাশ নামে ;
তার চোখের তারায় তারায় জ্বলে উঠেছিল যে সব জীবনকথা ----


তা যেন জানে আরো একা একার কেউ ;
তা যেন জানে সেই শুধুই !
যে আছে ওই উঁচু পাহাড়ের মাথায়‌ মুখটি গুঁজে;



আরো ঘুমে গেছিল যে সে , নাম না জানা  পথিক এক , তাকে কেউ কি চেনে আদেও ! 


বছর যায় , মাস  
তারই শ্বাসের শ্বাসাঘাতে আজও সেই রাতটি পায় না তাঁকে তেমনটি করে আর ----

জীবন যেন এমনই ;
ওহে ফাগুন- আগুন 
পোড়াও যে কাকে তুমি কোন আলোয় ;


জ্বালাও তোমার সেই না পাওয়া বেদনসুরে আরো এই বুকখানি ;
যে অনন্তরাগে পায় সে আপন আপন সুরের কথাটি ----


যে কথায় ঘুমে গেছে কার যেন বিষণ্ণ মুখখানি , চিরকাল ..!





৪৬.
তার লাল-কালো-হলুদে 
সকল কালো 
ধুয়ে নিই ----


ধুয়ে নিই তার মুখের আলোয়‌ 
এমন সকাল , যখন সে খুঁজে বেড়ায় 
চোখে চোখে 
এমনই একটি দিন 
যার ওপারে 
কার দেখা !


দেখার কোন সে ভুল 
ফোঁটায় ফুল ;
হলুদ লাল আর কালোয় থাকে 
কোন সে রঙের গভীর ঘুম ?


ও পলাশ 
কোন সে রঙে  
তাঁর রঙিন হওয়া বলো , সেটাই ভাবি ;----





৪৭.
ফুরায় দিন 
         ‌ ফুরায় 
সন্ধ্যা ডাকে,
এমন দিনেও তুমিই
              ‌জাগাও 
 যেদিন যায়
       শুধুই মেঘের 
 ‌                   ফাঁকে !

শাঁখে শাঁখে 
   ওই তো দূরের গাঁ...
রাঙামাটির ধুলায় 
ওড়ে 
ওড়ে তার পায়ের ভার 
বুকটি করে খাঁ খাঁ ;


জানি কি তার 
          সকল রঙ 
পড়ে কেন ঢলে ?


যেও না 
যেও না ফেলে 
আগলে রেখো 
           এমন খেলায় 
যে হেলায় 
এমন বেলা পেলেই 
দিনটি করি শুরু 
শেষের সে দিনটি 
                    ভুলে ...!






৪৮.

আজ মনে হলো 
তার কাছে যাই ---


তুলে ধরি চিবুকটি ,
অথচ শরীরটাই ;
মন কই মনোরমা !
ঘরের ভেতরে আকাশ হাউমাউ করে উঠলো চাঁদ -তারাদের নিয়ে ।


ওখানে কে দাঁড়ানো !


আমি কাকে ছুঁই!
কার বুকের ভেতর এই নিঃসঙ্গ মুখটি ডুবিয়ে কে চিৎকার করে উঠলো !


দেখি রক্তের তরঙ্গে সাঁতার কাটছে ----- আগুন-পলাশের ঢেউএ ঢেউএ......;


তবে কি বসন্ত এলো 
ওহে তোমার প্রদীপে !


এই রাত 
আরো কতো সহস্র বছর ওই অন্ধকারের তরঙ্গে‌  তরঙ্গে
ভাসতে ভাসতে চলে যায় যে
সেই মহামিলনের অপেক্ষায়
সেটাই ভাবছি -----







৪৯.
ছোটো তো ছোটো নয় 
বড়ো কে নেয় খেয়ে ;


তাকে আগলাতে যেয়েই
সে হয় দিকশূন্য --- 
আর 
এই সত্য বুঝতে পারি না বলেই 
কত জন্ম জন্ম নয় 
মিথ্যের কোলাহলে 
প্রজন্মের পর প্রজন্ম
যায় হারিয়ে ----


আমরা দোষ দিই 
সময়কে 
দোষারোপ করি 
সমাজকে 
চলে যাই শ্রেণীসংগ্রামে 
বুঝি না 
কেন যে আগলে ছিলাম -----


ছোটোর গর্ভেই ছিল 
বড়োর মৃত্যু কাহিনী লেখা .......




( ছবি : কল্পোত্তম )









Thursday, June 23, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস




৩১.
 না যদি এলে , এলো তো সে 


 ওই দেখ , নাচন তাঁর রক্তে রক্তে ধ্বনিত ;
 শানিত প্রবাহ ঘিরে 
               নির্জন ----


 যাইনি ফুরায়ে 
 ছাড়িয়ে আকাশ 
 ওই তো তারায়‌ তারায় 
                 রাতের চিতায় জ্বলছে ---


 সেই আঁধার দেখো 


 চেনোনি ! 
 তুমিও চেননি , দেখনি 
             সেই অসহায় ;


 কাঁদি আমি কাঁদি 
 জড়িয়ে তোমায় ;


 দূর মাঠে 
     গড়িয়ে নামছে‌ যে
              হাহাকার
 শতজন্মের সমাধি ঘিরে আমার শরীর,   তোমারই শরীরে মিশে যে গান গাইলাম   উভয়ে -----
 তারই সকল স্মৃতি ঘিরে চলেছ তুমিও ...


 আমার বয়স ফুরায় না ---- ফুরায় কেবল   তোমাকে ঘিরে ,  সেই 
              আজন্মকাল .....





৩২.
 দুপুরবেলায় 
 সামনের বাড়ির কার্ণিশে
 শরৎএর ঘুঘুকে ডাকতে শুনলাম ;
 মুহূর্তের আচ্ছন্নতা ভাসাতে থাকলো   কোথায় কোথায় যেন
                ঘুরতেই থাকলাম .....।


 এখন সন্ধ্যাবেলা 
 ঘুঘুটি নেই ---- অন্য আলোর লুকোচুরির ভেতর 
 আর একটি পাখির লুকোচুরি রয়েছে যেন;   সে যে কোথায়‌ কোথায়‌ নিয়ে চলে দুটি হাত  ধরে আমায়‌ ; আর কোনো মুখ আর মুখে থাকে না , শরীর----  


 সেও নেই 
 শত শত জন্মের ওপারে যেন দাঁড়িয়ে কারো হাতগুলি ---- 


 দেখা যাচ্ছে কী অপার আনন্দে 
 কী অসীম মেঘমালায় 
                           ভেসে ভেসে 
 সেই মিলন সম্পূর্ণ করছে !


 তিনিও যেন বাঁশি ---- আর তাঁর কাঁধে মাথাটি রেখে মূর্ছিত নয়নে  
 এ কোন রাধিকা সে ....?!






৩৩.
 তার পাথর বুকে 
 জল হয়ে ভেসে যাই .....


 কিছুটা ছিটিয়ে নিও সেই ধুলোয় ----যদি  স্রোতধারায়‌ সত্যিই জন্মায় কিছু;


 ধুলো আর ধুলো চারদিক ।


 পাথর কেঁদে উঠে বলে , কোথায় রেখে এলে তাকে ?
 সে যে অহল্যা-ভূমির মণিকর্ণিকা--- 
 যত খুশি মেটাও তৃষা 


 হেঁটে চলো একা একা, ওই তো হেঁটে চলেছে দেখ , সন্ধ্যার লালচে মেঘের 
                        আকাশ ছুঁয়ে 
 এই ঋতুর আজন্মকাল.......;





৩৪.
 ওই তো 
 কথারা রাতের কুয়াশায় মাখামাখি পড়ে আছে ঝোঁপ জঙ্গল জড়িয়ে ;


তবু কোথাও আকাশ পাচ্ছি না খুঁজে।  আকাশের আলো-অন্ধকারে জড়িয়ে 
উঠে গেছে কত কথারা 
                         জীবনের কাছ থেকে যেন, 
অনেকটা দূরে --- চাঁদ ডুবে গেছে। তারারাও  দমবন্ধ হাওয়ায় 
হারিয়ে ফেলেছে কত গল্পদের ;


কেউ নেই এমন , কাউকেই দেখা যাচ্ছে না বারান্দা ঘর হারিয়ে বাইরে বেরোতে । সকলেই জেগে নেই , জানো জাগার এমন কোনো উৎকন্ঠা নেই ---- সে কথা জেনে গিয়েই চাঁদও থাকেনি , তারারাও হারিয়ে গেছে অনেক দূর অবধি ---- যেখানের পাথর নজর ঘিরে চেয়ে আছে 
আমাদের কয়েকজনের রাত ;


যাদের এমন একটুকরো বারান্দার 
গল্প আছে বলেই 
কুয়াশাদের বিস্তার এই পাথরের 
                                দেশে দেশে....






৩৫.
থেকে থেকে হাই তুলছে ;
কোলের উপর গড়িয়ে পড়ছে কে যেন;
জীবন , তুমি কতদূর দেখতে পাও ?
জীবন , তুমি কত স্মৃতির ভেতর  
ব্যর্থ প্রেমিকের মত শিশু হয়ে  আছাড়িপিছাড়ি খাও ; বলতে পারে কি ওই পাহাড় 
ঘুম থেকে জেগে উঠে , জানি না তো ;  
কে যেন শ্বাস নেয় শুনি মহুল গাছটিকে টেনে নেয় বুকের ভেতর; তারপর হাওয়া হয়ে ছুটে আসে এত দূর---- 

কে যেন বলেছিল,বাড়ি যাবো, বাড়ি ফিরে চলেছি.....

----- দেশের বাড়ি ?

তার দেশ আছে , আমার কোনো দেশ নেই । তাহলে এত মানুষের পথের সঙ্গে‌ হাঁটি কেন ....?

মানুষের পথই তো আমার দেশ । মানুষের পথের সাথে সাথি হয়ে এই যে চলি , আরো কত জন আসে যায় 
আমার ঘুমের কোল জুড়ে !

সকলের সঙ্গেই আমার ফেরা । সকলের সঙ্গেই এক একটি পথ কত দেশের সঙ্গে ঝিমুতে ঝিমুতে বাড়ি ফেরে যে ------- সে কথাই ভাবছি আজ  
তার বাড়ি ফেরার খবর পেয়ে ----






৩৬.
একটি চুন-খসা দেওয়ালে 
কেউ আঁকতে চাইছে 
                       মুখ ;
অন্তরালে কে যেন পারদ ছুঁড়ছে ----


মাঠে ভেঙে-চুরে পড়ে আছে অনেক ছায়াশরীরীরা------ কেউ আহুতি আঁকার পরিকল্পনায় ধাক্কা দিচ্ছে ---- ধ্যানমগ্ন থাকে যেখানে গভীর সত্য ।


সে যখন দাঁড়ালো দেয়ালে , দেওয়ালও কথা বলে উঠলো 
অনেক জীর্ণতা ছাড়িয়ে ; 
ধ্যান ভেঙে ছুটিয়ে দেবার হৃদয় কি অল্পেতে থামতে চায় !


এক একটি করে 
গাছ পাতারা ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে  
ছুটে আসছে প্রকাশিত হবার তাড়নায়‌ ------ সেই অবগুন্ঠনকে ঠেলছে যতোই 
ততোই বর্ণময় হয়ে উঠছে জঙ্গল-ঘেঁষা নদীর উপরের মাঘীপূর্ণিমার চাঁদ ----


সে ছুটে যাবার চেষ্টায় 
বারবার সেই আলোকে কোষ- কেড়ে ধরতে চাইছে বিনম্র আহ্লাদে ! 


বর্ণময় হয়ে উঠছে 
সমস্ত আঙুলে 
শুভেচ্ছাপ্রাপ্ত আলো অন্ধকারের চলচিত্রপট ----- চুনখসা দেওয়াল  
                       তবুও কাঁদছে ----


কেন যে নিজেকে এতটা প্রসারিত করতে চাইছে জীবন !
তারপর যেন আর কোনো বিভাজন নেই 


দেওয়াল সচিত্র প্রকাশে বিস্তীর্ণ পূর্ণিমা ----


এই একাত্ম রূপ কি আলাদা হয় ?
সমস্ত দেওয়াল জুড়ে আজ 
সে গভীর রং লাগিয়ে দিয়েছে ......





৩৭.
সমর্পণে 
কোথাও কি পাপ আছে ?


অন্তরাত্মার আলিঙ্গনে 
লজ্জার প্রসঙ্গ আসলে 
ঘাবড়ে যাই । তবে কি সুদূর বলে 
কিছুতেই আর কিছু নেই !


স্বপ্নে কি ছুঁয়ে যেতে পারে না  
জ্যোস্নারাতের জলতরঙ্গরা .....


তাহলেও কি হাতটি রাখা যায় 
অন্তরাত্মার উৎসমূলে !


ভাসতে ভাসতে কেউ যদি 
প্রত্যক্ষ করেই 
কারো গভীর তৃষা ;
কেউ যদি জল- চাঁদ- মেঘে 
গড়াগড়ি খায় , বাদাবনের নোনাজলে , 
গান শোনাতে চায় কাউকে ; তুমি তাতে 
এত পাপ খুঁজে মরছো কেন ?


সে যে এত ছবি খামে ভরে পাঠালো 
সে যে তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতে 
শব্দের গেলাসে‌ দিলো চুমুক , তুমি‌ কি আর তাকে পাঠাবে না 
সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ভেঙে 
স্তব্ধতার আলিঙ্গনাবদ্ধ পাথর মূর্তিখানি 
একবারও !


বাতাসে‌ বারুদ-গন্ধ  
বাতাসে বিচ্ছিন্ন হানাহানির মৃত শরীর ;
বাতাসে তো লোভ আর লালসার 
                       আশাবাদী ছলনা ;


এসময় 
কেউ যদি একটুখানি দেখে ফেলেই 
অসম আনন্দের ছবিখানি,
নানা প্রলাপে ভেসে যেতে চায় 
মাঘী-পূর্ণিমার নোনাজলে ;
একটি চাঁদের ভেতর লক্ষ করে 
লক্ষকোটি চাঁদের তরঙ্গ ----
তুমি সেই জলরেখা ভেঙে , মুহূর্তের উচ্ছাসে 
দাঁড়াবে না রাধা নামের কলঙ্কে 
আর একটিবারও !?


সমর্থনে কোথাও তো 
লজ্জার অস্তিত্ব খুঁজে পাই না !





৩৮.
গান তো আমি গাই না
গায় , সেই  
নির্জন রাতের তারারা---- 


সেও 
সেই সুরে আকাশ জুড়ে দাঁড়ায় 
বিভঙ্গ মুদ্রায় ।


এরপর বনজঙ্গল-----পাহাড়----মেঘ 
একাকার করে 
হৃদয়ে আমার !


কান পাতো 
শুনতে পাবে 
তার পায়ের কান্না ;
মুদ্রা তুলে ছড়িয়ে পড়ছে
কতটা রাতের শিশিরে... ;


আমি তো রোজ তার
পায়ের পাতার উপর থেকে 
চোখের জল তুলি 
দু'হাতে ;----
কাটা-ফসলের মোথায় গড়াগড়ি খেতে দেখি 
তার সমস্ত রাতের প্রলাপ ----;


গান তো আমি গাই না 
গায় সে 
আমার গলায় ।
গান তো জন্মের অন্ধকার থেকে 
আলো খুঁজে খুঁজে হন্যে হয় 
জীবনের সুরে ----


কেউ কেউ পায় ,
পায়, সে মহার্ঘ্য  ?


জন্ম তো জন্মে জন্মে 
কতবার এলো আর গেল .....


কেউ কেউ জানে 
কেউ কেউ জানতে পায় সেই কথা -----


তবু তা সবটা নয় 
সবটা পেতে 
সবটা দিয়ে দাঁড়াতে হয়, সেই মুর্ছনায় --


যেখানে 
সবটাই মুক্ত-বিহঙ্গে চলেছে ভেসে ......





৩৯.
কোন নামে ডাকবো

সে তো সাতচল্লিশ থেকে 
একাত্তর,
সাতষট্টি থেকে নব্বই ,
ছয় থেকে একুশ ,
একই বিচ্ছিন্ন নদী 
পাহাড় ঘাসজঙ্গল ভেঙে শিউলি ছড়ালো .....;


আকাশ টুকরো হয়ে পড়ে আছে চাতালে ।


পুবে পশ্চিমে 
বেলা পড়ে আসে একটি রেখায় ।
পশ্চিমে পুবে 
কেবলই অসম আকাশের ঘোর।
খণ্ড খণ্ড মেঘেদের কারুকার্যে 
ক্লান্ত--- ধ্বস্ত--- 
একটি মুখই সকল মুখের ভেতর !


রাতের জানলায় অন্ধকার পথ চলেছে ছুটে.......
ফেরার মনকেমন জানে না 
পথের পাশে কারা এসে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ ।


এই পর্যটন 
পর্যটন না ----ঠিকানা যেমন ঠিকানায় নেই স্থির---- ঘর কে যেন ঘরের মতোন 
দেখতে এসেছিল বলেই 
বাড়ি ফেরা ভুল হয় কেবলই......


বাড়ি কি একবারও বাড়ির দুয়ারে 
দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলতে পারলো , ওই তো ঠিকানা ঠিক করে দেব বলে 
আজ তাকে ভোরের আকাশ  
স্পষ্ট করে দেখাবেই ------
তাকে আর মিথ্যে জ্যোস্নায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না 
কারো গালের স্পর্শ পেতে -----






৪০.
আড়ালে দুলতে চেয়েছ বলেই ,
এই রোদে চেয়ে থাকি---  
ঘামতে চেয়েছো 
বলেই........;


শীতরোদ মাখামাখি জানলায় 
ডানা গুটিয়ে আসলো উড়ে ......
ঘুরে ঘুরে প্রলাপ শোনাই ---- আলোর অর্থ বোঝাই ---- সামর্থ নেই যে, হারাই‌ 


তাই কি যখন তখন পাঠাই ছবি ?
ভাবি , এটা নয়‌, ওটা নয় , তাহলে তাইতে ;


বাইতে বাইতে
যাই চলে ,
পাই আর না পাই 
ধাই সেই সুরে ----
ঘুরে ঘুরে যে জ্বরের ঘোরে কাঁপলে তুমি 
তাই চুমি ,
এ বৃক্ষ - কথার ব্যাথার ঘোরে 
তুমি শোনাও গান যদি,

দানের প্রাণে বাজাই হারমনি
জানি জানি 
উচ্ছাসে নেই বিশ্বাস 


তাই তো আড়াল 
তাই তো রোদ
গুটোনো ডানার ভেতরে রাখি 
মুখটি আমার -----


জ্বরের ঘোরে প্রলাপ পাঠাই 
কার শরীর যায় ভিজে আজ ----?





৪১.
এই শীতরাতের কুয়াশায় 
কে যেন ডুবিয়ে রেখেছে তার শরীর---- 
কাঁকরে পাথরে ধুলোয় মাখামাখি সেই মুখ , 
ঝাপসা ; পথপাশে দাঁড়িয়ে
ও কী , বৃক্ষলতা 
না কি কারো ছায়ামেঘ সরিয়ে 
                              চলে যায় কেউ 

রাতের একান্ত সংলাপগুলি সে সব ।

সারাটা পথ আজ সে গোপন শরীরে একান্ত অন্তরটি ডুবিয়ে 
পাখা মেলেছিল যেন ;
তার ডানার শব্দের অনুভব 
পাঠিয়েছিল পশ্চিমের আকাশ আমায় ;

পাহাড় পাহাড়ের ওপারে ডুবে ছিল 
কাকে নিয়ে যেন -----ছিল না পলাশের বনে
হাওয়া মুখের চলাচল ; বাতাসেরা কাঁদাচ্ছে
বুঝি , অনেক শীত রাতের চাঁদেদের ......!

একটু একটু করে মিলিয়ে যায় 
আমাদের অনুভবের ভেতর 
অনেক প্রিয় ভূমি-কথারা -----

তাঁকে তার মতো করে চিনিনি যে কেন ,
চিনেছি কি তার অন্তরবিষাদ ?

শীতরাতের কুয়াশায়  
কাঁকড়ে পাথরে ধুলোয় যে পথটি চলেছে 
তার সাথে ঘুরে ঘুরে 
চলেছে ছুটে ..... আমিও কি তার সওয়ারী হই ---- !

রাতেরা ফুরোয় কত রাতের সুখতারায় ডুবে ডুবে ----- ভোরের দেখা পায় বুঝি 
কখনও কখনোও ! সেই সব রাতেরা যখন 
একা একা ফুরোয়, ফুরোয় পথে পথে .....

মুখটি কার যে বুঁজে আছে 
ওই দূরের পাহাড়ে !
বাসি চাঁদে গড়াগড়ি খায় কে ও ! 

আকাশটাই বিছানা বিছিয়ে ছিল যেন কারও
                  সেই অস্তসোহাগে......!






৪২.
রাত তো একার না !

অনেক কথারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে
প্রিয় অপ্রিয় মুখে -----;


তার ভেতরে অনেক আকাশ ভাসে ।


আমাদের সকল সময় 
সময়েই নেই -----
সময় আপন আনন্দেই পাগল হয় ।


কাঁদেও ----


সে কান্নার শব্দ তুমি শোনো নি কখনও !
সে কান্নার নুপুর বাজে 
কোনো এক নির্জন রাতের পায়‌.....


তুমি কি সেই  
কুয়াশায় কুয়াশায়
পাহাড়ের নিচু ঢালে
অনেক বসন্ত ফোঁটাও...... ;


চিঠি পাঠিও 
পলাশে পলাশে কথা হলে, দুধারী পথের হাওয়ায় ------ কারা যেন রঙিন হতে চেয়েছিল সেবার ----


রাত তো একার না 
প্রিয় অপ্রিয় সুখে .....;





৪৩.
সব অপেক্ষার আকাশকে 
একদিন ঘিরে ধরবে সাদা মেঘ ;

সেদিনও রঙে রঙে আরো রঙিন হবে পলাশেরা --- 


মাটি আর ফুলে 
কথা কওয়াকয়ি
শেষ হবে না কি কোনোদিনও?
এই নিঃসঙ্গতার কথা শোনে কে আর কতকাল !


সে প্রকৃতির প্রলাপ 
শুনতে পায় ক'জন আর কানে ;


অনুভবের স্মৃতি দিয়ে 
তাকে শুধু চেয়ে দেখ একবার অন্তত , 
সেই সব আকাশকথাদের ;


হাজারো বর্ণময়তায় চলে যায় 
যে চোখের আড়ালে 
আমাদের অদেখা দৃশ্যগুলো ....!



 ( চিত্রশিল্প : পর্ণা দাশগুপ্ত মিত্র )





Monday, June 20, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস



২৫.
এ কোথায় চলেছো 
শুরু হয়েছে যেখানে 
          স্বপ্নের পথ ....?


তুলে দিলে দু'হাত           
           ভরিয়ে 
মেঘেদের আকাশ নয়,
কাশ-মেঘের অনেক 
             দৌড়-কথা ---
কত গল্পের সঙ্গে কত গল্পের মহারূপ পূর্ণ করলো সে , সে কথা যদি সত্যি-ই জানতে, সেইসব ঝর্ণা-দের 
নদী হয়ে যাওয়া 
     রূপ-কথাদের..... ;


এরপর কাশেদের 
         ‌শারদ ডাক ----
শুরু হয় যেন রোজ এক একটি জীবন নতুন করে ....


কেন শুধুই নারী হয়ে ওঠো বারবার ---- একটি বার দুর্নিবার ঢেউ হয়ে 
        দেখই না কেন ;





২৬.
তার চোখ 
মেঘেদের বর্ণমালায় হারিয়ে যায়  
আমরা ভাষা খুঁজি---- লিপি অক্ষরে গড়ি  কালের অনেক অবহেলিত দৃশ্যমালাদের --- সেও ভুলে যায় কোথাকার নাগরিকত্ব কোথায় কেমন ভাষায় লেপ্টে যায় কার মুখের মাঝে -----


আকাশেরা চলেছে যেন অনেক আকাশের তথ্যচিত্র তৈরি করে  
ছুটতে ছুটতে ......


অস্পষ্ট স্বরে আজ যত দূরে সরে যায় 
ততোই আতঙ্কিত হই 
পরবর্তী অধ্যায়ে .....;


মেঘেদের বর্ণমালায় 
সেজে উঠে যে ভাষায়ই তাঁকে অনুবাদ করতে যাই 

দুর্বদ্ধতা অসীমে নৃত্যরত ----সে যেন কেবলই ঝঞ্জা---- 


যে চমকেই তাঁকে রেখাঙ্কিত করি না কেন , এমনকি তুমি নিজেও চিনতে পারো নি, সেই খেয়ালী রূপ ; একটি হু হু
পথই ছুটছে শুধু--- ছুটছে .....

কখন সে তাঁর চোখ ভেঙে গড়িয়ে নামবে এই খাঁ খাঁ বুকের উপর  

সেই বিভঙ্গ রূপ দেখে, এই পড়ন্ত বেলারাও যেন 
সকালবেলার হাসিমুখ ভাঙতে থাকবে অনেক অদৃশ্য মাঠের আয়নায়‌ ; 

নতুন ভাষা শিখে নিও হে মহাপ্রাণ , নতুন ভাষা ------- যে অনন্তকাল তাঁর মুখ এঁকে চলেছে 
এইসব মেঘেদের বর্ণমালায় ......






২৭.
সময় আমার যায় যে
বাকি দিনের বাঁকে বাঁকে ....


ঘরে ঘরে ঘুরি কার ?
আবার ঘরের মাঝেই 
                       মরি ;
যেই সরি 
মুখটি অমনি ভার।


আমি যে কার 
কে আমার!
তাঁহার দিনেই ঘুরি ফিরি, পাই আর না পাই , চাই যে তাঁকেই 


সে হয় কি ;
না, আমি হই তাঁর!


কার কার মাঝে তাকেই খুঁজি ....?


সময় আমার যায় যে
    সময়ের ওপার -----
অপার হয়ে থাকি 
 সেই চোখেরই কোনায় ?






২৮.
অন্ধকারে 
কোথাও একটু আলো চলকে উঠলে 
মনে হয় বাতাসে ভেসে এলো মহানদী -----
আচ্ছা , অন্ধকার কি কখনো বিশুদ্ধ হয় , ওই আকাশের মতো নির্মল আনন্দে ? 
তারাদের নিঃসঙ্গতা যখন হাঁটু গেড়ে  
পড়ে থাকে রাতের ধু ধু ফসলশূন্য মাঠে‌---- আমাদের ভেতরের নিরন্নতাকে  
কে আর জানে , সেই সব পল্লির পথে পথে ঘুরে , নগরের ধূসরতায় মেশে যখন ;


তিনি কোথায় কোথায় ঘোরেন , কোন বিহ্বলতায় ; তিনি কি শুনতে পারেন , একটু আগে , সমস্ত অন্ধকারের ভেতর থেকে একঝলক আলো  
চলকে উঠেছিল বলেই , আমরা তাঁর মুখ দেখলাম আজ সামান্য আলোয় !


ও , বিভঙ্গ তরঙ্গ 
তুমি আরো দূরে চলে যাও, যে প্রাণ চলেছে ছুটে অন্ধকারের 
       মহাসমুদ্রে.......





২৯.
মনে হলো তার কাছে যাবো ,
দু'হাতে তুলে ধরবো চিবুকটি ; 


শরীরটাই আছে , শরীরে মন কই  
তোমার মনোরমা ?


ঘরের ভেতর হাউমাউ করে উঠলো চাঁদ-তারারা ---- উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ালো ; এখন আমি কাকে ছুঁই ?
কার বুকের ভেতর নিঃসঙ্গ মুখটি ডুবিয়ে আমিও খানিক চিৎকার করে উঠবো ---- বলবো , এই তো রক্তের তরঙ্গে সাঁতার কাটছো তুমি আগুন-পলাশের ঢেউএ ঢেউএ ........ ;

তবে কি বসন্ত এলো 
ওহে, তোমার প্রদীপে ?

এই রাত 
আমাদের হাহাকারে আরো কত সহস্র বছর তরঙ্গে তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে চলে যেতে থাকবে যে,

সেই মহামিলনের অপেক্ষায় ----
সেটাই ভাবছি ;





৩০.
তার বিচিত্র খেয়াল 
প্রহসন চেনালো ;


কী খেলায় মেতেছে 
ধর্মাধর্ম ;
জীবন চেনেনি জীবনের ন্যায় অন্যায় কিছুই কখনো!


নৈঋতে আছো 
উত্তরে , দক্ষিণে
পশ্চিমে ,পুবে ---
যতোই চাও না কেন 
সব বিফলে ;


আছি 
তবুও আছি ,
সকল চৈতন্য জুড়ে 
      আমিই ----


দেখ তো তোমার আমাকে ঘিরে ;
যত দূরেই যাও না কেন ,যতোই ফেলো না কেন জাল 
কুয়াশার সকল বৈচিত্র তুমি  
হাঁটুতে ভাঙতে পারো নি ,দুরছাই বলে ;----
শিশিরে 
নিয়রে মাখামাখি এই যে অঘ্রাণ 
পথে পথে করে চলেছি প্রদক্ষিণ , চালতা বনে, বকুলে 
মুকুলে , যে অর্যুণ বৃক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম নির্জন ;
সে কান্না-কথায় 
দুর্বল সামর্থের 
কোনো অধিকার নেই । 


জানি , আমার সকল ঘিরেই  
তাঁর দয়া 
আমার সকল নিয়েই তোমার খেলায়‌ যে ঢেউ চলেছে .....


তাতে কোথাও নেই 
সেই দীর্ঘশ্বাস 


বাজি আমার বাজির পরে বাজি ; যে অস্থি-পাশায়‌ কুরুক্ষেত্র ----- সেখানেও তুমিই সখা 
জানি ;

গাণ্ডিব খসে নি, খসে নি অঙ্গিকার 
যুদ্ধেও আছি , আছি তাঁহার 
প্রকৃত না‌ জেনেই...... !?




( ছবি : দীপ্তিশিখা দাস )






Sunday, June 19, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস


১৮.
সকল উপস্থাপনেই
প্রত্যুত্তরের  অপেক্ষা থাকে ।
দেখা না গেলেও উৎসমুখ
উদগিরণ তো থেমে থাকে না !

থামিয়ে রাখা যায় না যাত্রা পথকেও ;
থাক না কেন সেপথে যে কেউ 
প্রত্যেকেরই ছায়া পড়ে থাকে 
চুপচাপ পথের উপর ।

দেখার চোখ থাকা চাই শুধু ;
কতজনেরই তো আছে সে সব ,
তাই বলে কি সকলেই দেখে ?

তুমি যাই ধারণ করো‌ না কেন ,
তোমার মুখও তো মানুষের, চোখ ও ;
শুধু গতির তরঙ্গে 
সে না হয় আলাদা;

জন্মের মুখ যদি দেখি, সম্ভবনা টের পাওয়া যায় তাহলেও, টের পাওয়া যায় 
কী কী কেমন ;
কেমন ভাবেই বা এসেছিল জোয়ার, তারপর তো থাকলোই সকল প্রবাহ -----

প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা সকল উপস্থাপনেই ,
উৎসমুখে চাও 
তাহলেই জানতে পারবে প্রকৃত উদগিরণ বিভাজিকা;

আমি চেয়ে চেয়ে দেখি গতির স্রোতধারা
অন্য দিকে তারপর 
যে যে আসে ,
তার ভাসমান গতিকে ধরি ----- 
তখন তুমি শুধুই ছবি না , ছবির অন্তরে হাজারো কথা ----

বৃষ্টি শুরু হলো......; 
বৃষ্টি কি একটু আগেও  শুরু হয়েছিল রোদের ভেতর ....? জবাগাছটি ভিজছিল একাকী , হাজারো কথায় । তুমি তাঁর ডাক শুনতে পাও নি ?

আমি কিন্তু পাঠিয়েছিলাম প্রচুর রেণু ----- 
ঝুমকো জবাদের দেখা যায় না আর , সেই যে কানের দুলের মতো দুলতো হাওয়ায় ; কত অভিমানে দাঁড়িয়ে থাকতে যেভাবে তুমি !





১৯.
অর্ঘ হয় না যে ফুলে 
সেই ফুল সংগ্রহে যাই
খানা-খন্দ খুঁজে 
কচুরিফুলে ভরি ডালা। বকুল তখন আড়চোখে চায়। জলকলমীতে তাকে গড়ি । ভূঁইকলমীর কথা আজও ভুলিনি !
প্রচুর শস্যফুলে ভরিয়ে ফেলি তার আঁচল । পথের কোনায় ঘাসফুলেরা বাতাসে দোলে। দেখেছো কি চালতা ফুল ? কাশফুল  বাতাসে প্রচুর ওড়ে ----

দেবী তোমাকে চেনেন কি , তুমিও যাও না মনে হয় সে পুজোয় --

অর্ঘ হয় না যে ফুলে --- সে ফুল সংগ্রহে-ই--- এই জীবন ;

ফুলেরা ফুল হয় না তবু , আমিও অবহেলিত এই ফুলের মাঝে, দুহাত তুলে সেই প্রচুর মেঘের ওপারে ভেসে গেলাম -------
অনেক আকাশের কথা নিয়ে .....?!






২০.
কেন যে এত কালোতে দাঁড়ালে---
সমস্ত রেখার ওপারে 
                   খুঁজি......

দৃশ্য উল্টে যে আবহ রচনা করো 
তার দক্ষিণে ফোঁসে 
এ কোন সাগর !


উত্তরে প্রচুর শীতেরা ।
তাহার সূর্য তাহাতে হারালো কি ?
পশ্চিমও অনেক রাঙামেঘের কান্না নিয়ে যায় .....

তাঁকে চেনো ,
তাঁকে দেখো ;
নিজের ছায়াতে নিজেই গুঁড়িয়ে যাও
       যদি তারপর ,

গুছিয়ে ফ্যালো সেই বুক, আপন আনন্দে .... ;





২১.
সে দিন 
তুলসী-মঞ্চ ঘিরে বড়ো হলো যে স্বাদ আহ্লাদের ছবি ;

আমাদের নিয়ে গেল যেন কত শিশুমুখে ;
ঘোরালো
তারপর কোন সে অফুরন্ত ছেলেবেলা ...?

কাগজের চরকি হাতে ঘুরলাম 
কতো যে বনজঙ্গল পাহাড়ি পথ .....

আমি কি জঙ্গলমহল চিনি 
নাকি জন্মান্তরে 
           সে ঘোরা ?

বড় হলো সব 
বড় হলো কি মন ?

হাওয়ারা 
গাইতে থাকলো কত যে ঝুমুর 
কত বনপলাশের পদাবলী .....

আমরা কেউ কারো শৈশব চিনি না ।
কেউ কারো পথ ....;

কত পাহাড় জঙ্গল নদী -পথ হারিয়ে যায় ----- আমাদের ছেলেবেলারা কত ছবি ধরে ভূতের মতো ঘোরে তবু ----- কেমন আকাশে কখন যে....!






২২.
মনে করো 
এখন আমরা কেউ নেই । বাতাসে বিন্দুবৎ প্রাণেরা ---- না হয় মাটিতেই দাঁড়ালো ;
আর যা যা 
তাদেরও মুখ দেখার দরকার নেই ----- 

প্রতিপক্ষের যুদ্ধ কি থামলো ?

বাতাসের ভর কি শুধুই 
প্রেম অপ্রেমে ---?

তিনিও বললেন, আর কিই বা বলি বলো , তোমাদের 
আর কিই বা দিতে পারি ?

বললাম, না , মাথা তো থেকেও নেই ------ তাও নানা মাথা ব্যাথায় ভুগি ; তবু ব্যথার কথা বলতে পারা যাবে না। এখন যা কিছু সবই আপনার, আপনিই তো বলেছেন, তারও পর আমিই ------ ;

আর কোনো চিন্তা নেই, কি বলেন ? কিন্তু চারপাশে ওই যে দেখতে পারছি আপনার আলো-বাতাসে একটি দিন ফুরিয়ে 
কীভাবে সব ইচ্ছেরা একটি নদী হয়ে গেল নীরবে ---- 
তারপর কত দূরে নেমে গেলো...... কোথায়----? আপনি বললেন, ওই তো, ওপারে, আরো ওপারের ওপিঠে, যেখানে আলো দিচ্ছেন ;----- যেখানে আমাদের চেহারা আর খুঁজে পাচ্ছে না ----- যে চেহারায় 
একমাত্র সেই ছিলো ;

চেহারাদের জন্য আর কতো মায়াই বা, নামই নেই যখন, শুধুই প্রাণ ! তাও তিনি বলছেন, সবই -----;

শ্যামা যে কাঁদছে , কাঁদছে কতো রূপন্তিরা --- দীপ্তি মেখে ; তাদের কী হবে ? 

তিনি বললেন, তাই তো, তাহলে ওদের এখনো হতে বাকি ।
শরীর পেয়েও প্রাণের মধ্যে আমাকে আড়াল করার এত কি আছে, চিনতে চাইছে না ! তাহলে ফিরিয়ে নিক সব পেছনকে, দেখতে পাবে প্রকৃত বিরহ কীসের ছিলো ;

ঝপাঝপ কারা যেন নুয়েও, দাঁড়িয়ে গেল ।পেছন ফিরে দেখা গেল, আয়নার ভেতর দমবন্ধ হাওয়ারা তখন 
লাফালাফিতেই ব্যস্ত ;

সব যেন ফিরতেই 
চাইছে ----
তাও যা যা কষ্টার্জিত, শেখানে সবই কি শরীরই চায়,
শুধুই চোখের জল 
দেখবে বলে ....?

আচ্ছা ধরো , তারপর দেহই পেল প্রকৃত ;
সে কি তখনও ঘুম থেকে উঠে বলবে ,শরীর বিহীন এই মুগ্ধতা চাই না তো ; চাই মিলন সুখে প্রতিদিনের সেই প্রাতঃকৃত্য ---!?







২৩.

ভালোবাসা ----- অবান্তর সমর্পণ ;
বন্ধুত্ব ---- মহাশক্তিধর  হিসাবের খাতার  মাপজোক ..!

কে কার পাল্লায় সব মাপছে ?
কে কার পাল্লায় অধিক ঢলন দেখলো!

অন্তরাত্মার এই বাণী কে শোনে ?
শোনে কি প্রকৃতিও ?
প্রবাহ থেকে প্রবাহে পাল্টে যাচ্ছে সব ।
ধ্বনিতরঙ্গে উবজে পড়ছে অহেতুক কমনীয়তা ?

প্রসাধনী পাল্টাও...... 
প্রসাধনী পাল্টাও.......
ফেরিওয়ালা হাঁকছে --- কে কী নেবে গো ----- কে কী নেবে.....
বিচিত্র সম্পর্কের জৌলুস ফেরি করছি ---- লাগলে বলতে পারেন ; মা-ঠাকরুণ , দিদিমণি সকল , কার কী কী চা....ই..... ?

ভালোবাসা পুড়িয়ে 
ওই তো ফিরে গেল ছায়া-শরীরীরা একে একে .......

পথের হলকায় 
সে তার বিগত বয়স মেপে বার কয় ছুটেছিল ,কিশোর- কিশোরীর‌ মতো .....।

কেউ তার হাত দু'টি ধরলো না-----ফিরিয়ে দিল নিতান্ত মুগ্ধতাটুকুও ;---- যা সে গ্রাম্য পথে , ক্ষেতের কোনায় , মুগ্ধ হাত পেতে গ্রহন করেছিলো বিগত জন্মে ?
সে কি প্রেতাত্মার চিৎকার‌ ! 
সে কি ধুলোমলীন কিশোরবেলার হা ডু ডু , চি কিত্ কিত্ .....!

কথা হয় না অন্তরাত্মার ধ্বনি - তরঙ্গে‌ একাকী রক্তের ?

তাই তো সহজ স্বীকারোক্তি , বন্ধুত্ব চাই , তুমি শুধু বন্ধু হও , ওহে পরিযায়ী আগুন্তুক --- যতক্ষণ না এই ধুলো বাতাসে মিশে যাই ----
ভালোবাসা দুর্বলতা । পায়ের শেকল । চোখ শুধু উল্লাস চায় ---- উল্লাস ..... কাঁদতে চায় না আর , কেঁদেছে তো অনেক, সকল বাসনারা , মা ভাই বোন , পিতা প্রপিতামহের হাত ছাড়িয়ে , তাই তো এখন নিছক বন্ধু , বন্ধুত্বের বিনিময় চাই ----- অহেতুক মনখারাপ চাই না ---- উল্লাস ,উল্লাস চাই ---- উন্মত্ত উল্লাস ......;

আগুন-মেঘের মতো বিকেলের আকাশ আমি ----- আগুন-মেঘের নীরব চিৎকারে মিশে থাকবো সেই  আসন্ন সন্ধ্যায় ......!







২৪.
সকলের সকল মগ্ন-মুহূর্ত 
আলিঙ্গন করে 
এ কোন ধ্রুব-তারায় তাঁর পাশ ফিরে শোয়া ?
ভঙ্গিটি দেখে অপলক 
চেয়েছিল যেন 
ওই দেবদারু বৃক্ষের মাথাটি ;
অনন্তকাল ---- সে কথা কেই বা জানে ,
তুমি জানো কি ?

হয়তো জানো , হয়তো জানো না ----- তা না হলে এত কিছু রেখে এত পাল্টাও কেন ?আমি কেন পারি না ,পাল্টে যায়‌ কেমন দেখ তোমার সময় !

এই সেদিন এক বিছানায়‌ যার সঙ্গে শুয়ে পড়লাম , আজ সেই অচ্ছুৎ ভেবে , মিথ্যে ধারণায় যা যা করে ফেলল ভুল , তারই কলহে ডুবে নিজেকে আর একবার আত্মশুদ্ধির পরিবর্তে প্রতিহিংসায় করছে ছিন্নভিন্ন ;

যাক , এসব ভেবে 
এই ভোরেরবেলার নিসর্গের কাছে 
তোমার এমন সর্বব্যাপী পাশফিরে চেয়ে থাকা চিত্রটির সব সত্য থেকে আমি তো আর মুখফিরিয়ে 
থাকতে পারিনে ;-----

তাই তো 
আসন্ন এই ভোরের ভেতর তোমাকে প্রত্যক্ষ করছি , আমাদের মঙ্গলময় কোনো এক আরতির জন্যে -----



( ছবি : দীপ্তিশিখা দাস )









Thursday, June 16, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে



পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস




১৫.
এসেছি যখন
যেতেই হবে ।
এ কথা বলায় কোনো জড়তা নেই ।

নেই ঠিকই---- তাই বলে কি বেলা এগারোটার ওই স্তব্ধ টগরফুলের উজ্জ্বলতা 
দেখবো না 
এমন বৈশাখের রোদে! 

তা বলে কি 
একটিবারও চেয়ে থেকে মাধবীলতার ডালে 
তার মুখের কথা ভাববো না ?

সময় অসময়ের মৃত্যু- আতঙ্ক থেকে তাকে ঘোরাতে বলবো না 
             ‌ ‌  মুখ -----
তা কী করে হয় !

ভাবতে পারি না 
সত্যিই ভাবতে পারি না ,আজ সে সাল-শেগুনের জঙ্গলে অনেক দিন পরে হাঁটবে.......

নির্মল হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কারণ তার দুয়োর থেকে সব শেকলের ভার সরে‌ গেছে ------ বাতাসে ভাসাবে সে এবার সমস্ত  জঙ্গলমহলের আকাশ 
কুমারী নদীর কূলে 
দাঁড়াবে দুহাত ছড়িয়ে‌---- ;

এসব ভাবার মধ্যে 
রূপন্তী যদি দীপ্তিকে 
                   পায় ,
সে বা তারা যদি ভোলে
তাদের জন্ম-ফাঁস -----
আমিও তো চাইবো-ই 
এমন অপলক ,
ওই স্তব্ধ জবা গাছটির 
      ‌                 দিকে ,
চাইবো-ই ,  টগর গাছটির দিকে একঝলক !

রূপন্তী বলুক আর না বলুক 
দীপ্তি হাসুক 
তার ঢাল সবুজ পাহাড়ে কিছুক্ষণ -----

এমন হরিণ দৌড় ছেড়ে কেন এখনি ভুলে যাবো জঙ্গলমহলের চাঁদকে দেখেছিলাম যে একদিন দুলতে ;

সকালের রোদ-ছায়াতে মিলে আমিও 
একাকার করে দেবো আজ সমস্ত সীমানার তরঙ্গ .......

পাঠাবো সেই ছবি 
জীবন যেখানে 
জীবনের আনন্দে 
মগ্ন হয়ে দেখতে থাকবে সকল প্রবাহ মোড় 
ঘূর্ণায়মান মৈথুন রূপটি তাঁর ?






১৬.
আর পাঠাবো না ভাবনাদের ,
এবার তারা 
নিজস্ব খেলায় 
কাবার করুক 
একলা দিন ;

খেলা তো কারো সাথে কারো না ,
খেলা তো আপন আনন্দের দিনলিপি....।

কেউ দেখুক আর না দেখুক, তার জন্যে কি রোদেরা নামবে না পথে ; জ্যোস্নারা ঘুরবে না বাগানের ভেতর ?

সে তো দেখে না 
দেখার জন্যে যেসব অন্যমনষ্কতার প্রয়োজন, যেন হিসাব বিহীন খাতা খোলা ,
তা তো অতিমাত্রায় সুখ-ঘুমে সঠিক রাত পায় না ;
দিবাঘুমের অনেক স্বপ্নকথাদের জানি আমি , জানি আহার- বিহারে তাদের 
নিষ্প্রয়োজন বিহ্বলতা -----

তাই ,
তাকে আর পাঠাবো না ---- ভেতরের ভাষ্কর্য ; 
রোমন্থনের প্রকৃত প্রশান্তি কেমন করেই বা জানবে 
জন্মান্তরের এই সব 
               ভ্রান্তিরা !

নদী তো নদী‌ না 
যদি সে ভাবে 
তবেই -----

কলসির ভেতরেই পিপাসারা খুঁজে মরে  ‌সামান্য সেই অববাহিকা ------

খেলা যতোই গভীর হোক, আলোরা যতোই পাক এলোমেলো কথাদের, কোথাও নেই তো একটুও অন্যমনষ্কতারা .....!





১৭.
বেলা চড়ে যাচ্ছে 
স্থির দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে .... 

বললাম না, নিয়ে যাবো, এত কি কাজ ?

কথা দিয়েছিলাম তার সাথে যাবো,
আজ সেই কথা রাখতেই এত হাঁকাহাঁকি, উঁকিঝুঁকি ? 

বললাম, যাবো, কিন্তু ফিরে আসা চাই ----

সে ফাঁকি দিতে পারে না, কারণ তার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা তো বড়জোর সামনের বাড়ির উঠোন ;

আমাদের কোনো উঠোন নেই --- বাগান ;

যা কিছু লুকিয়ে , লুকিয়েই এই যাওয়া ---নিজেকে রেখে , নিজের মনটাকে দেবে বলেছিলো ;
বলেছিল , ও আমি পারি , তুমি শুধু নিঃশব্দে কাঁধে চড়ে বসো --- তারপর বলো কোথায় কোথায় যাবে ......?

বাতাস ফুড়ে চললো .....আমি শুধু দুদিকে দুটি নাম তাকে 
                বললাম....;
দু-প্রান্তে দুটি হাত ছড়িয়ে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দি , সেও ছো মেরে ছুঁইয়ে-ই ডুবিয়ে দিলো ! আর খুঁজে পাই না তল ----ডুব দিয়েও দেখতে পাই না মাটি ---- কত জল-শেওলাদের চলাচল ....; কত শামুক গেড়িগুগলিদের সঙ্গে হামাগুড়ি দিতে দিতে ,দুই প্রান্তে দুই প্রকৃতি ছুঁয়েই ---- এই গোপোন অভিসার ..... ;

সে যে কখন কত গভীরতা থেকে ওঠে ভেসে ---- অফুরন্ত ভৎসনায় লাল করে দিলো ! বললো , এই তোমার প্রিয়জন ! এদের নিয়ে এত কান্নাকাটি !
অন্তত এদের থেকে ভালো অনুভব দিয়ে বুকের উপর রাখতে পারতাম তোমায় ,------
তুমি একটি একটি করে পাঁপড়ি মেলিয়ে দেখতে ----দেখতে কত সে সব মুখ,------এমন সুবাস কোথায় তুমি পেতে , এমন সোহাগ ----! 

তা না ,এত পথ ভেঙে 
নদী নেই , জল ; শুধুই পিপাসা ---- আছে , কেবলই চর্বিত চর্বণ !

পাহাড় কেটে 
গাছ ;
ঝরনায় বাঁধ দিয়ে 
সে তার সকল খাড়িতে জ্বালিয়ে দিয়েছে আগুন ।
ওদিকে শস্যশেমলা বাঙলায় সকল নীরবতা ভেঙে ছুটে চলেছে ইঞ্জিনের নৌকো ..... কোথায় পঙ্খীরাজ ?

যারা দিয়েছিল কথা ---তারা অনেক গল্পের ঘুম নিয়ে ,ভ্রান্ত বাতাসে ভাসছে....।

তাই এই আকাশ 
এই জল
এই নদী 
কোথাও কোনো ঠিকানা নেই তোমার ।

বেলা চড়ে যাচ্ছে....
চড়ে বসো ফের 
সকল অস্থিরতা ভেঙে 
এই নির্ভার কাঁধে ---- হাত ধুয়ে ফিরে চলো ....

যত ক্লেদ মেখেছ শরীরে -----




( ছবি : সুমিত সরকার )





Wednesday, June 15, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে




পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস




১১-ক

কথা ছিলো সব খুলে ফেলবো
ছায়ার ভেতর ছায়া খুলে 
বসে পড়বো জলের মতোন......
দৃশ্যরা দৃশ্য থেকে সরে কথা বলবে ---চলবে অন্তরঙ্গ সংলাপ কিছুক্ষন ,
পাখিরা উড়ে যাবে সব জড়তা ভেঙে .....

অথচ পর্যটন পর্যটন-ই রইলো। আমরা আবারও বন্দী 
হয়ে গেলাম। যেখানে 
বিগত সংলাপের চিহ্নটুকুও নেই । খাঁক হয়ে গেছে সব আয়োজনের উচ্ছাস !





১১ - খ

খড়কুটো ঠোঁটে 
         উড়ে বেড়াচ্ছে ওখানে 
                কারা ----
পথ আর পথে নেই 
পথ চলে গেছে নব অরণ্যের দিকে .....
নির্জন আকাশ ছুঁয়ে কথা বলছে সভ্যতার ভূতেরা এখন ----

ছায়ায় ছায়া মিশে ফিসফাস হেঁটে বেড়াচ্ছে ছায়ার কঙ্কালেরা .....
পিঠে তাঁদের কোন কুরুক্ষেত্রের সংলাপ?

ছায়া‌ থেকে ছায়া খুলে 
একটি আঙুলের উপর ধরে কেউ যেন পুরোনো কথা স্মরণ করিয়েছিল ----'আর একটি --- তাহলেই পাল্টে যাবে সব .....; '

কথা ছিলো 
দু'জনে দু'জনের দিকে ছুটে একটি ছায়ায় ছায়া হয়ে যাবো ----

পাখির মতোন আকাশ পাবে সকালের অরণ্য যখন 
বিশুদ্ধ ছায়ার শরীরে---- ?






১২.
তাঁর ধুলো-বাতাসে 
ভাসতে চাইলে 
এক ধরণের গন্ধ ;
লালমাটি উঠে গিয়ে যেন মানুষ রূপ পায় 
জানায় অভিবাদন ;
বরণডালা তুলে ধরে সাল-শেগুনের মুখের উপর ;
মেঘফাগুনের আকাশ উড়িয়ে দেয়.....

শুধুই প্রশান্তি 
হাওয়ায় হাওয়ায় কেবলই গান ....

আমাদের হৃদয়ে আজ 
পরিব্রাজকের অনন্ত শুধুই ----

সে তো জানে না 
তার রূপের খুশিতে ঝুরোমাটির 
ভাষা কেমন হয় ----

পথের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে                      তাঁর শুষ্ক মুখের ছায়া খানিক মুখে মাখি ;

এই ধুলো-বাতাসে 
ভাসতে আসি বলেই, সকল গঙ্গা লুকোয় 
মহাকালের জটায় --- !

এই ধুলো বাতাসে ভাসতে চাই যেই ,
চলার পথের উপর এক ধরণের 
গন্ধ পাই ---- 

দুঃখ হয় 
সে, সে সুবাস টের পায় না ----- টের পায় না এই চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারও ;------






১৩.
সিগনাল না পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল
যে ট্রেন, দূর মাঠে 
তাল গাছের মাথায়
তখন যে সূর্যাস্ত ---
লাফ কেটে কেউ কেউ
              নেমেও গেল,
কেউ যেন রসের হাঁড়িটি পেড়ে আনবে বলে ছুটলো .....

ওপাশে খাড়া পাহাড়
পাথরে পাথরে
ভাসছে রাঢ়বাংলার
                সুবাস ---
ওদিকে ইঞ্জিনের সেই
ঘ্রাণ নিয়ে যাবে আরো
               কত দূর 
কেউ তা জানে না -----

সত্যি সত্যিই স্টেশন
কোথাও আছে কি ---
যেখানে রোজ দেখা হয় আমাদের !

কথা ছিল 
এরপর পথের গান শুনবো
করতালি উঠবে
সব শিমুল-পলাশে ....

দেখতে পেলাম না বলে এবার সেও 
মুখ লুকিয়ে নিলো 
           তাঁর -----?





১৪.
সে তো বনজঙ্গলের পাহাড়ি ফুল
পাখিদের ডানায় খোলা আকাশ ----

তার দরজা বন্ধ নেই 
জানলাও খোলা 
যত খুশি আলো মাখো 
                  ‌ গায় ------
আমাদের যে টুকু মাঠ 
             প্রান্তর 
সেখানেও দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখতেও ভয় এখন ।

এই আতঙ্কের সাথে 
ভাষা বিনিময় 
করতে করতে 
ক্লান্ত 
ঘুম নেই 
বিছানা চাদর বালিশ 
সব কিছুতেই 
একটিই কথা ,  দরজা বন্ধ করেছো ..?‌

ফোন আসে না 
তাহলে কি কথা বলতেও ভয় ?
ভয় কি সব সম্পর্ক জুড়ে বুকের উপর মস্ত একটি বিভাজিকা ----

সামনের মাধবী ফুলের গাছটির দিকে 
চেয়ে থাকি 
কই , সেও তো বোবা!

তার ফুলেরা কি বলে,
পাহাড়ী পাখিরা ?
বলে নাকি হরিণেরা ছুটে যায় ওই তো .....

তার রাতজাগা চোখের-জঙ্গলে 
ছায়া-জোস্নায় বাঘের আতঙ্ক নেই কোনও.......?!




( ছবি : সুমিত সরকার )



Monday, June 13, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে



পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস




৭.
ডাকছে যে
কী করি ---- আবার যাবো .....?

কেন যে কেবলই ডাকে !

কাল রাতে দাঁড়িয়েছিলাম বারান্দায়
ভাবছি, কেন যে কার গলার স্বর শুনি কেবলিই বাতাসে .....!

সময় বলে, বড় অসময় ;
সময় অসময় বলছে কেবলই, কোথায় বিকেল, কোথায়ই বা 
               রাত .....?

শোনো শোনো 
এখনি শোনো, এ তো চিরকালের ডাক......

সাড়া দাও 
সাড়া দাও 
দিন যে যায় চলে ; 

কে আর অমন করে নেয়ই বা -----

ও পলাশ ভালো থেকো ।






৮.
ঝরা পাতা আর পলাশের মাঝে 
যে উঠলো ফুটে,
যার সুন্দর নিয়ে এলো 
তাকে,
আলোরা কাঁপতে থাকলো । আকাশে আকাশ গেল ভেঙে ---

সেই হাওয়াদের চিনি কি ?

ও মাটি, তোমায় প্রণাম । ও বৃক্ষ, তোমার ফুলে ফুলে 
ফুটেছে দেখ কেমন 
পলাশ আজ ..... ;

না দেখলেও, দেখি 
না গেলেও, যাই 

তোমার মাটিতে তুমিই আকাশ 
তুমিই বৃক্ষ
তুমিই ফুল .....!

তাও সে সবের কেউ না আমরা যেন ;

আজ যা হলে, কালও
থেক, সেও কি ঘুরে ফিরে গেল মানুষের এই বসন্তে..;







৯.
সব বন্ধ করে বসে‌ আছি । সাবানের ফেনার মধ্যেও 
অজানা-আতঙ্ক লুকিয়ে আছে ।

আমি তার কোন হাতটা ধুয়ে তুলবো !

কতকাল আমরা কেউ কারো কাছে আসিনি। 
কতকাল ------ 

সাবানের ফেনার ভেতর আজ 
আমাদের নবপ্রজন্মকে ধুয়ে তুলে দিচ্ছি যে অনিশ্চয়তা ----
তাতেও নদী আসে 
পাহাড়,
আসে, না-ছোঁয়া অরণ্য ...... 

সব ঠিকঠাক দেখা গেলেও 
সব ঠিক না 

তার সেই কমনীয় দুইহাত জুড়ে 
যে অবিশ্বাস লেগে গেল আঠার মতো---
তাই, তাকেও আর 
         নিশ্চিন্তে .....;

কোথায় দাঁড়াবো 
কোন দিকে 
কোনখানে গেলে 
তার নাকের ফুলের উপর জ্বলে উঠতে দেখবো সেই সব 
বিশুদ্ধ নক্ষত্রদের ....

যে আকাশে আজ 
অসংখ্য মৃত-মুখ ভেসে বেড়ায় ......।





১০.
সে চোখ খুললে 
জেগে ওঠে সূর্যেরা সব ---- ঘুম ভাঙে আমাদেরও 
সেই কলকাকলিতে--- 
পাখিরা এসে সব-- শাখায় বাঁধে বাসা,
গায় সুখ-দুঃখের গান ...... ;

সে সব সব ঘটতে থাকে ওই দু'চোখের ভেতর একটি স্তব্ধতায় !

আমরা তার কেশ-বিন্যাস দেখি,
সেলফিতে হাসতে দেখি এক গভীর আয়নাদের ;

সে যে কত যত্নে পাঠিয়ে দেয় 
এক একটি অভিপ্রায় 
এক একটি মহড়ার নিপুন বুনন .... ;

কই, কোথাও তো কোনো বিষণ্ণতা ‌নেই ,
নেই সমস্ত দিনের হাহাকার, আতঙ্কদের অনাহারী মুখ----- 

জঙ্গলমহলের বাতাসে আজ শুধুই বুঝি 
ভাঙা বসন্তের ছেঁড়া পলাশেরা ওড়ে .....!

সেই চোখের পাতা খুললে, পাহাড় শাল-সেগুনের ছায়ায় তাই হাজারও কথা 

সে ঘুমে গেলে 
যে আলোরা নিভে যায় চারদিক অন্ধকার করে----- 
তখন কুমারী নদীর অপর পাড়ে ভেসে বেড়ায় যেসব চাঁদেদের ঘর-দুয়োর ;
আমরাও যেন চাঁদ-তারাদের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলে যাবো আজ 
                কিছুক্ষণ....

তার ঘুমের মুখের উপর 
এমন একটি প্রতিবিম্বের জন্যে 
যে সেলফিতে 
      সে তাকে নিজেই 
              চিনতে পারে না।

তাই ঘুমের ভেতর একা একা সেও কেঁদে ওঠে..........।




(ছবি দীপ্তিশিখা দাস)



Sunday, June 12, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে



পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস



২.
কত নাম না জানা !

তার বুকের নিচেয় ধুকপুক করে উঠতে দেখি
তোমার মুখের রেখাদের ;

কী যে কমনীয় অসহায়তা সে সব ---
সে যে কত জীবনের গান
এই একলা পথের ;

জীবন যেন তারই গলায় চলেছে ছুটে....

সে যে কত পথ
কত নদী
কত মাঠ চিরে গড়ে দেয় তাঁকে ------

সেই মূর্তিই একমাত্র সম্বল
সেই আলোয়
মেঘে,
ছায়ায় গড়ে যে শরীর 
তাও যে কতকালের উপাসনা---- 
সে কথা কি জানা হলো এই ধুলায় ধুলায়.....

ওহে মেঘ-রোদের কাশবন 
কতবার আমি যে তোমাতে নদী হই 
কতবার পাহাড় 
কত সমুদ্র ওড়াই
তার বুকে, সে কথা যদি ঠিকঠাক কেউ জানতো, তাহলে এই শরীর 
এই মান অভিমান
এই বোধ 
সকলই হতো তারই -----

সে যে কাঁদে এই ভাদ্রের পথের আলোয়, এই রোদে ...

আমি যে কী করে যাই ফিরে
কোথায়ই বা যাবো ?
কী করেই বা যাই ভুলে
যা কিছু ধরা দিয়ে যায় চলে, ওই দূরে ....

যে ছিল 
একটু আগেও নির্বাক!





৩.
তার জন্যে ভেতর থেকে খোদাই করে
আনলাম দুইহাত ------

সে একটি করে ফুল ফোটাক
লতায়পাতায় ভরিয়ে দিক 
চোখের একটান কাজলে 
যেমন ক্যানভাস খোলে মুখ 
ভাসতে ভাসতে মেঘেদের কণারা মেঘে মেঘে‌ ঘোরে‌ যেভাবে ......;

সেই সব পাতাবাহার‌ কুড়িয়ে জড়িয়ে 
তার সকল সৌন্দর্য রেখায় গন্ধে বয়ে যাক -----

মুগ্ধতায় চেয়ে থাকুক সকল আনন্দ ----
সে সব সব তাকে দেব বলেই তো 
এই সুরমাধূর্য করেছি প্রতিস্থাপন --------;

লক্ষ জন্মের অভিশাপ ভেঙে এমন মাধুর্য উদযাপনে যাক সেই মহার্ঘ্য সুরে 
যার উপর উজাড় দাঁড়াতে পারে সকল নিঃসঙ্গতা ---------

একমাত্র সেই তো জানে সেই মুর্ছনা 
কেমন হলে রাতের ট্রেনের ভেতর দুলতে থাকে কোন আগমনী.....!

তারপরও সকল যন্ত্রণার পোড়া পাখনা ওঠে উড়ে‌ ....

উড়ে আসে এমন এক ইচ্ছে-পতঙ্গের কান্নারা ; যাদের ডানায় অনেক নৈসর্গিক অবয়ব;
সে এমন স্থলপদ্ম হাসতে থাকে সবটা জুড়ে যেন ....।

এ জন্ম ---- সত্যিই কি জানে সে সব !

তাই বুঝি গড়ে ওঠে 
সকল অলিখিত সম্পর্কে বিচিত্র এক পৃথিবীর অপার নামফলক -----?

সে যেন ঘরের বারান্দা জুড়ে হেসে বেড়ায় তখন । আকাশের ডানাভাঙা রূপমুগ্ধতায় সে হয় অনেক কাহিনীর একটিই গল্প -----

যে ‌বুকের উপর 
হাঁটু ভেঙে বসুক পুনরায় অন্য আর এক জয়দেব -----
 




৪.
এভাবেই বার কয় 
পথের নদীর ভেতর 
ভাসতে ভাসতে
উদ্বাহু দাঁড়িয়ে থাকলাম থমকে ;

তোমার স্রোতস্বিনীর তরঙ্গে 
জলের ঘুর্ণির ভেতর 
আলিঙ্গনাবদ্ধ ;

কে যে তখন 
কোন্ উচ্চাঙ্গ সংগীতে
কোথায় নিয়ে তাকে 
কোথায় ফিরিয়ে দেয়‌---- 

আমি অভিভূত ; 
চেয়ে থেকেই যেন
    কত জন্ম পার করে 
                    দিচ্ছি ----

একটি গল্পের ভেতর 
ছায়াছবির মতোন 
    কথা দিলাম যেই

সে আবার ভাসতে ভাসতে দাঁড়ালো ।
তাকে নতুন করে গড়ে তুলতে অলিখিত সম্ভবনারা 
আর এক দিগন্ত ছাড়িয়ে 
একটিই সাক্ষর রাখতে ছুটে আসছে যেন .......;





৫.
প্রস্তুত ছিলো !

অপেক্ষা ভেঙে 
তাই খানখান হচ্ছিল 
বুকের ভেতর ?

একটি ইশারা বুঝতে 
এতটা সময় পার হয়ে গেল !

উঁকি দিল সে, ডাকলো, বুঝোলো,
'গন্ডি ভেঙে বের হয়ে 
ডাকতে‌ পারলে না ---'

যার কথা ইষ্টনাম হয়ে 
     গান হয়ে গেল .... ;
সুর বুঝলে না বলে 
সুর খুঁজে চললে ....?

যেভাবে খুঁজে খুঁজে 
মানুষ জন্ম পার করে 
               প্রাণ ----
মহাপ্রাণের পরিচয় করাতেই ডেকেছিল 
                 সে--- 
বুঝিয়েছিল , দুটি চোখের স্তম্ভিত বিষাদ‌! 

' তাও গন্ডি ভেঙে 
  ডাকতে পারলে‌ না.?'

যেন একটি প্রদক্ষিণ শেষ হলে 
আর একটিতেই চলে গেল এই জন্মের সকল বয়স  ..... ; 

কেউ কেউ যেন বলে গেল , পিছুটান ----

দিন আনতে 
দিন ফুরোলো
সে সাধন, কখন ?
শত উদযাপনেও 
সে বাঁধন জোড়া যায় না ।

প্রস্তুত ছিলে কি ?
অনেক অপেক্ষা ভেঙে খান খান হয়েছিল -----;

যদিও ইশারা বোঝানো গেল না যেন ---- সময় পার হয়ে গেল সময়ের হাতটি 
          ছাড়িয়ে ----
সেও কি ঘুরে, ফিরে গেল , এই জন্মের  পথে পথে একা একা..?





৬.
তার মাথায় পলাশ দেখে 
এবারের বিমুখিনতা ক্ষমা করি ।

মন দিয়ে চেয়েছিলাম বলেই ,
এই বসন্তও লুকিয়ে ফেললো মুখ --- ?

সুখে থেকো 
আনন্দে ফুটে থেকো 
পাহাড়ী মেঘের মতো .... ;



(ছবি দীপ্তিশিখা দাস)


Saturday, June 11, 2022

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে



পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস


১.
অনেকটা দূর থেকে এই হেমন্তকে
মিলিয়ে নিতে চেয়েছি বলেই
অনেক বিপন্নতার কোলে
মাথা পেতে দেওয়া ;


বিশ্রাম চেয়েছিলে 
যেখানে 
সেখানেও কপটতার শিকার সবটা---- ?


সেই রহস্যময় হাসি 
চেন নি ।
চেন নি অভ্যাসকে ব্যবহার ক'রে যে ষড়যন্ত্র রচিত ;----


প্রকাশের মধ্যে যে শান্তি 
তাকেও এমন ভাবে 
 ব্যবহার করা যায় ?


মন খুলে বলতে চেয়েছো বলেই ,
গোপন কর নি কিছুই;
যদিও প্রবৃত্তিকে সংযত করাও অন্যায় 
আর এই দেখাই 
তাকে আলাদা করলো -----

যদি তাই হয় 
তাহলে আবারও সে ,
সেই অভ্যাসের গগন-ফাটানো চিৎকারের 
সঙ্গেই গলা মেলাও 
যতোই আসুক বিপন্নতা ;-----


আচ্ছা , সেখানেও কি তুমিই----- ?
না হলে এই হেমন্তে তার কথা মনে পড়বে 
                    কেন ?!

যে অনেক দূরে -----


দূর সংক্ষিপ্ত করে দেয় আজও
এই আশ্বিনের শেষ- 
                      দুপুর 


তাই তো , তারই ছায়ায়  মাথা পেতে থাকি কিছুক্ষন , 
বিশ্রাম চেয়েছিলাম বলেই               ‌            
সব প্রতিবন্ধকতা ভেঙে তাকেই অনুভব করি ----






ছবি : দীপ্তিশিখা দাস


পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে দীপংকর রায়‌ উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস ১৬৩. একটিকেই চিনি, দুদিকে প্রসস্ত সকালের অন্ধকার যার... নৈঃশব্দ সেই ঘু...