পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে
দীপংকর রায়
উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস
১৮.
সকল উপস্থাপনেই
প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা থাকে ।
দেখা না গেলেও উৎসমুখ
উদগিরণ তো থেমে থাকে না !
থামিয়ে রাখা যায় না যাত্রা পথকেও ;
থাক না কেন সেপথে যে কেউ
প্রত্যেকেরই ছায়া পড়ে থাকে
চুপচাপ পথের উপর ।
দেখার চোখ থাকা চাই শুধু ;
কতজনেরই তো আছে সে সব ,
তাই বলে কি সকলেই দেখে ?
তুমি যাই ধারণ করো না কেন ,
তোমার মুখও তো মানুষের, চোখ ও ;
শুধু গতির তরঙ্গে
সে না হয় আলাদা;
জন্মের মুখ যদি দেখি, সম্ভবনা টের পাওয়া যায় তাহলেও, টের পাওয়া যায়
কী কী কেমন ;
কেমন ভাবেই বা এসেছিল জোয়ার, তারপর তো থাকলোই সকল প্রবাহ -----
প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা সকল উপস্থাপনেই ,
উৎসমুখে চাও
তাহলেই জানতে পারবে প্রকৃত উদগিরণ বিভাজিকা;
আমি চেয়ে চেয়ে দেখি গতির স্রোতধারা
অন্য দিকে তারপর
যে যে আসে ,
তার ভাসমান গতিকে ধরি -----
তখন তুমি শুধুই ছবি না , ছবির অন্তরে হাজারো কথা ----
বৃষ্টি শুরু হলো......;
বৃষ্টি কি একটু আগেও শুরু হয়েছিল রোদের ভেতর ....? জবাগাছটি ভিজছিল একাকী , হাজারো কথায় । তুমি তাঁর ডাক শুনতে পাও নি ?
আমি কিন্তু পাঠিয়েছিলাম প্রচুর রেণু -----
ঝুমকো জবাদের দেখা যায় না আর , সেই যে কানের দুলের মতো দুলতো হাওয়ায় ; কত অভিমানে দাঁড়িয়ে থাকতে যেভাবে তুমি !
১৯.
অর্ঘ হয় না যে ফুলে
সেই ফুল সংগ্রহে যাই
খানা-খন্দ খুঁজে
কচুরিফুলে ভরি ডালা। বকুল তখন আড়চোখে চায়। জলকলমীতে তাকে গড়ি । ভূঁইকলমীর কথা আজও ভুলিনি !
প্রচুর শস্যফুলে ভরিয়ে ফেলি তার আঁচল । পথের কোনায় ঘাসফুলেরা বাতাসে দোলে। দেখেছো কি চালতা ফুল ? কাশফুল বাতাসে প্রচুর ওড়ে ----
দেবী তোমাকে চেনেন কি , তুমিও যাও না মনে হয় সে পুজোয় --
অর্ঘ হয় না যে ফুলে --- সে ফুল সংগ্রহে-ই--- এই জীবন ;
ফুলেরা ফুল হয় না তবু , আমিও অবহেলিত এই ফুলের মাঝে, দুহাত তুলে সেই প্রচুর মেঘের ওপারে ভেসে গেলাম -------
অনেক আকাশের কথা নিয়ে .....?!
২০.
কেন যে এত কালোতে দাঁড়ালে---
সমস্ত রেখার ওপারে
খুঁজি......
দৃশ্য উল্টে যে আবহ রচনা করো
তার দক্ষিণে ফোঁসে
এ কোন সাগর !
উত্তরে প্রচুর শীতেরা ।
তাহার সূর্য তাহাতে হারালো কি ?
পশ্চিমও অনেক রাঙামেঘের কান্না নিয়ে যায় .....
তাঁকে চেনো ,
তাঁকে দেখো ;
নিজের ছায়াতে নিজেই গুঁড়িয়ে যাও
যদি তারপর ,
গুছিয়ে ফ্যালো সেই বুক, আপন আনন্দে .... ;
২১.
সে দিন
তুলসী-মঞ্চ ঘিরে বড়ো হলো যে স্বাদ আহ্লাদের ছবি ;
আমাদের নিয়ে গেল যেন কত শিশুমুখে ;
ঘোরালো
তারপর কোন সে অফুরন্ত ছেলেবেলা ...?
কাগজের চরকি হাতে ঘুরলাম
কতো যে বনজঙ্গল পাহাড়ি পথ .....
আমি কি জঙ্গলমহল চিনি
নাকি জন্মান্তরে
সে ঘোরা ?
বড় হলো সব
বড় হলো কি মন ?
হাওয়ারা
গাইতে থাকলো কত যে ঝুমুর
কত বনপলাশের পদাবলী .....
আমরা কেউ কারো শৈশব চিনি না ।
কেউ কারো পথ ....;
কত পাহাড় জঙ্গল নদী -পথ হারিয়ে যায় ----- আমাদের ছেলেবেলারা কত ছবি ধরে ভূতের মতো ঘোরে তবু ----- কেমন আকাশে কখন যে....!
২২.
মনে করো
এখন আমরা কেউ নেই । বাতাসে বিন্দুবৎ প্রাণেরা ---- না হয় মাটিতেই দাঁড়ালো ;
আর যা যা
তাদেরও মুখ দেখার দরকার নেই -----
প্রতিপক্ষের যুদ্ধ কি থামলো ?
বাতাসের ভর কি শুধুই
প্রেম অপ্রেমে ---?
তিনিও বললেন, আর কিই বা বলি বলো , তোমাদের
আর কিই বা দিতে পারি ?
বললাম, না , মাথা তো থেকেও নেই ------ তাও নানা মাথা ব্যাথায় ভুগি ; তবু ব্যথার কথা বলতে পারা যাবে না। এখন যা কিছু সবই আপনার, আপনিই তো বলেছেন, তারও পর আমিই ------ ;
আর কোনো চিন্তা নেই, কি বলেন ? কিন্তু চারপাশে ওই যে দেখতে পারছি আপনার আলো-বাতাসে একটি দিন ফুরিয়ে
কীভাবে সব ইচ্ছেরা একটি নদী হয়ে গেল নীরবে ----
তারপর কত দূরে নেমে গেলো...... কোথায়----? আপনি বললেন, ওই তো, ওপারে, আরো ওপারের ওপিঠে, যেখানে আলো দিচ্ছেন ;----- যেখানে আমাদের চেহারা আর খুঁজে পাচ্ছে না ----- যে চেহারায়
একমাত্র সেই ছিলো ;
চেহারাদের জন্য আর কতো মায়াই বা, নামই নেই যখন, শুধুই প্রাণ ! তাও তিনি বলছেন, সবই -----;
শ্যামা যে কাঁদছে , কাঁদছে কতো রূপন্তিরা --- দীপ্তি মেখে ; তাদের কী হবে ?
তিনি বললেন, তাই তো, তাহলে ওদের এখনো হতে বাকি ।
শরীর পেয়েও প্রাণের মধ্যে আমাকে আড়াল করার এত কি আছে, চিনতে চাইছে না ! তাহলে ফিরিয়ে নিক সব পেছনকে, দেখতে পাবে প্রকৃত বিরহ কীসের ছিলো ;
ঝপাঝপ কারা যেন নুয়েও, দাঁড়িয়ে গেল ।পেছন ফিরে দেখা গেল, আয়নার ভেতর দমবন্ধ হাওয়ারা তখন
লাফালাফিতেই ব্যস্ত ;
সব যেন ফিরতেই
চাইছে ----
তাও যা যা কষ্টার্জিত, শেখানে সবই কি শরীরই চায়,
শুধুই চোখের জল
দেখবে বলে ....?
আচ্ছা ধরো , তারপর দেহই পেল প্রকৃত ;
সে কি তখনও ঘুম থেকে উঠে বলবে ,শরীর বিহীন এই মুগ্ধতা চাই না তো ; চাই মিলন সুখে প্রতিদিনের সেই প্রাতঃকৃত্য ---!?
২৩.
ভালোবাসা ----- অবান্তর সমর্পণ ;
বন্ধুত্ব ---- মহাশক্তিধর হিসাবের খাতার মাপজোক ..!
কে কার পাল্লায় সব মাপছে ?
কে কার পাল্লায় অধিক ঢলন দেখলো!
অন্তরাত্মার এই বাণী কে শোনে ?
শোনে কি প্রকৃতিও ?
প্রবাহ থেকে প্রবাহে পাল্টে যাচ্ছে সব ।
ধ্বনিতরঙ্গে উবজে পড়ছে অহেতুক কমনীয়তা ?
প্রসাধনী পাল্টাও......
প্রসাধনী পাল্টাও.......
ফেরিওয়ালা হাঁকছে --- কে কী নেবে গো ----- কে কী নেবে.....
বিচিত্র সম্পর্কের জৌলুস ফেরি করছি ---- লাগলে বলতে পারেন ; মা-ঠাকরুণ , দিদিমণি সকল , কার কী কী চা....ই..... ?
ভালোবাসা পুড়িয়ে
ওই তো ফিরে গেল ছায়া-শরীরীরা একে একে .......
পথের হলকায়
সে তার বিগত বয়স মেপে বার কয় ছুটেছিল ,কিশোর- কিশোরীর মতো .....।
কেউ তার হাত দু'টি ধরলো না-----ফিরিয়ে দিল নিতান্ত মুগ্ধতাটুকুও ;---- যা সে গ্রাম্য পথে , ক্ষেতের কোনায় , মুগ্ধ হাত পেতে গ্রহন করেছিলো বিগত জন্মে ?
সে কি প্রেতাত্মার চিৎকার !
সে কি ধুলোমলীন কিশোরবেলার হা ডু ডু , চি কিত্ কিত্ .....!
কথা হয় না অন্তরাত্মার ধ্বনি - তরঙ্গে একাকী রক্তের ?
তাই তো সহজ স্বীকারোক্তি , বন্ধুত্ব চাই , তুমি শুধু বন্ধু হও , ওহে পরিযায়ী আগুন্তুক --- যতক্ষণ না এই ধুলো বাতাসে মিশে যাই ----
ভালোবাসা দুর্বলতা । পায়ের শেকল । চোখ শুধু উল্লাস চায় ---- উল্লাস ..... কাঁদতে চায় না আর , কেঁদেছে তো অনেক, সকল বাসনারা , মা ভাই বোন , পিতা প্রপিতামহের হাত ছাড়িয়ে , তাই তো এখন নিছক বন্ধু , বন্ধুত্বের বিনিময় চাই ----- অহেতুক মনখারাপ চাই না ---- উল্লাস ,উল্লাস চাই ---- উন্মত্ত উল্লাস ......;
আগুন-মেঘের মতো বিকেলের আকাশ আমি ----- আগুন-মেঘের নীরব চিৎকারে মিশে থাকবো সেই আসন্ন সন্ধ্যায় ......!
২৪.
সকলের সকল মগ্ন-মুহূর্ত
আলিঙ্গন করে
এ কোন ধ্রুব-তারায় তাঁর পাশ ফিরে শোয়া ?
ভঙ্গিটি দেখে অপলক
চেয়েছিল যেন
ওই দেবদারু বৃক্ষের মাথাটি ;
অনন্তকাল ---- সে কথা কেই বা জানে ,
তুমি জানো কি ?
হয়তো জানো , হয়তো জানো না ----- তা না হলে এত কিছু রেখে এত পাল্টাও কেন ?আমি কেন পারি না ,পাল্টে যায় কেমন দেখ তোমার সময় !
এই সেদিন এক বিছানায় যার সঙ্গে শুয়ে পড়লাম , আজ সেই অচ্ছুৎ ভেবে , মিথ্যে ধারণায় যা যা করে ফেলল ভুল , তারই কলহে ডুবে নিজেকে আর একবার আত্মশুদ্ধির পরিবর্তে প্রতিহিংসায় করছে ছিন্নভিন্ন ;
যাক , এসব ভেবে
এই ভোরেরবেলার নিসর্গের কাছে
তোমার এমন সর্বব্যাপী পাশফিরে চেয়ে থাকা চিত্রটির সব সত্য থেকে আমি তো আর মুখফিরিয়ে
থাকতে পারিনে ;-----
তাই তো
আসন্ন এই ভোরের ভেতর তোমাকে প্রত্যক্ষ করছি , আমাদের মঙ্গলময় কোনো এক আরতির জন্যে -----
( ছবি : দীপ্তিশিখা দাস )

No comments:
Post a Comment