দীপংকর রায়
উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস
৩১.
না যদি এলে , এলো তো সে
ওই দেখ , নাচন তাঁর রক্তে রক্তে ধ্বনিত ;
শানিত প্রবাহ ঘিরে
নির্জন ----
যাইনি ফুরায়ে
ছাড়িয়ে আকাশ
ওই তো তারায় তারায়
রাতের চিতায় জ্বলছে ---
সেই আঁধার দেখো
চেনোনি !
তুমিও চেননি , দেখনি
সেই অসহায় ;
কাঁদি আমি কাঁদি
জড়িয়ে তোমায় ;
দূর মাঠে
গড়িয়ে নামছে যে
হাহাকার
শতজন্মের সমাধি ঘিরে আমার শরীর, তোমারই শরীরে মিশে যে গান গাইলাম উভয়ে -----
তারই সকল স্মৃতি ঘিরে চলেছ তুমিও ...
আমার বয়স ফুরায় না ---- ফুরায় কেবল তোমাকে ঘিরে , সেই
আজন্মকাল .....
৩২.
দুপুরবেলায়
সামনের বাড়ির কার্ণিশে
শরৎএর ঘুঘুকে ডাকতে শুনলাম ;
মুহূর্তের আচ্ছন্নতা ভাসাতে থাকলো কোথায় কোথায় যেন
ঘুরতেই থাকলাম .....।
এখন সন্ধ্যাবেলা
ঘুঘুটি নেই ---- অন্য আলোর লুকোচুরির ভেতর
আর একটি পাখির লুকোচুরি রয়েছে যেন; সে যে কোথায় কোথায় নিয়ে চলে দুটি হাত ধরে আমায় ; আর কোনো মুখ আর মুখে থাকে না , শরীর----
সেও নেই
শত শত জন্মের ওপারে যেন দাঁড়িয়ে কারো হাতগুলি ----
দেখা যাচ্ছে কী অপার আনন্দে
কী অসীম মেঘমালায়
ভেসে ভেসে
সেই মিলন সম্পূর্ণ করছে !
তিনিও যেন বাঁশি ---- আর তাঁর কাঁধে মাথাটি রেখে মূর্ছিত নয়নে
এ কোন রাধিকা সে ....?!
৩৩.
তার পাথর বুকে
জল হয়ে ভেসে যাই .....
কিছুটা ছিটিয়ে নিও সেই ধুলোয় ----যদি স্রোতধারায় সত্যিই জন্মায় কিছু;
ধুলো আর ধুলো চারদিক ।
পাথর কেঁদে উঠে বলে , কোথায় রেখে এলে তাকে ?
সে যে অহল্যা-ভূমির মণিকর্ণিকা---
যত খুশি মেটাও তৃষা
হেঁটে চলো একা একা, ওই তো হেঁটে চলেছে দেখ , সন্ধ্যার লালচে মেঘের
আকাশ ছুঁয়ে
এই ঋতুর আজন্মকাল.......;
৩৪.
ওই তো
কথারা রাতের কুয়াশায় মাখামাখি পড়ে আছে ঝোঁপ জঙ্গল জড়িয়ে ;
তবু কোথাও আকাশ পাচ্ছি না খুঁজে। আকাশের আলো-অন্ধকারে জড়িয়ে
উঠে গেছে কত কথারা
জীবনের কাছ থেকে যেন,
অনেকটা দূরে --- চাঁদ ডুবে গেছে। তারারাও দমবন্ধ হাওয়ায়
হারিয়ে ফেলেছে কত গল্পদের ;
কেউ নেই এমন , কাউকেই দেখা যাচ্ছে না বারান্দা ঘর হারিয়ে বাইরে বেরোতে । সকলেই জেগে নেই , জানো জাগার এমন কোনো উৎকন্ঠা নেই ---- সে কথা জেনে গিয়েই চাঁদও থাকেনি , তারারাও হারিয়ে গেছে অনেক দূর অবধি ---- যেখানের পাথর নজর ঘিরে চেয়ে আছে
আমাদের কয়েকজনের রাত ;
যাদের এমন একটুকরো বারান্দার
গল্প আছে বলেই
কুয়াশাদের বিস্তার এই পাথরের
দেশে দেশে....
৩৫.
থেকে থেকে হাই তুলছে ;
কোলের উপর গড়িয়ে পড়ছে কে যেন;
জীবন , তুমি কতদূর দেখতে পাও ?
জীবন , তুমি কত স্মৃতির ভেতর
ব্যর্থ প্রেমিকের মত শিশু হয়ে আছাড়িপিছাড়ি খাও ; বলতে পারে কি ওই পাহাড়
ঘুম থেকে জেগে উঠে , জানি না তো ;
কে যেন শ্বাস নেয় শুনি মহুল গাছটিকে টেনে নেয় বুকের ভেতর; তারপর হাওয়া হয়ে ছুটে আসে এত দূর----
কে যেন বলেছিল,বাড়ি যাবো, বাড়ি ফিরে চলেছি.....
----- দেশের বাড়ি ?
তার দেশ আছে , আমার কোনো দেশ নেই । তাহলে এত মানুষের পথের সঙ্গে হাঁটি কেন ....?
মানুষের পথই তো আমার দেশ । মানুষের পথের সাথে সাথি হয়ে এই যে চলি , আরো কত জন আসে যায়
আমার ঘুমের কোল জুড়ে !
সকলের সঙ্গেই আমার ফেরা । সকলের সঙ্গেই এক একটি পথ কত দেশের সঙ্গে ঝিমুতে ঝিমুতে বাড়ি ফেরে যে ------- সে কথাই ভাবছি আজ
তার বাড়ি ফেরার খবর পেয়ে ----
৩৬.
একটি চুন-খসা দেওয়ালে
কেউ আঁকতে চাইছে
মুখ ;
অন্তরালে কে যেন পারদ ছুঁড়ছে ----
মাঠে ভেঙে-চুরে পড়ে আছে অনেক ছায়াশরীরীরা------ কেউ আহুতি আঁকার পরিকল্পনায় ধাক্কা দিচ্ছে ---- ধ্যানমগ্ন থাকে যেখানে গভীর সত্য ।
সে যখন দাঁড়ালো দেয়ালে , দেওয়ালও কথা বলে উঠলো
অনেক জীর্ণতা ছাড়িয়ে ;
ধ্যান ভেঙে ছুটিয়ে দেবার হৃদয় কি অল্পেতে থামতে চায় !
এক একটি করে
গাছ পাতারা ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে
ছুটে আসছে প্রকাশিত হবার তাড়নায় ------ সেই অবগুন্ঠনকে ঠেলছে যতোই
ততোই বর্ণময় হয়ে উঠছে জঙ্গল-ঘেঁষা নদীর উপরের মাঘীপূর্ণিমার চাঁদ ----
সে ছুটে যাবার চেষ্টায়
বারবার সেই আলোকে কোষ- কেড়ে ধরতে চাইছে বিনম্র আহ্লাদে !
বর্ণময় হয়ে উঠছে
সমস্ত আঙুলে
শুভেচ্ছাপ্রাপ্ত আলো অন্ধকারের চলচিত্রপট ----- চুনখসা দেওয়াল
তবুও কাঁদছে ----
কেন যে নিজেকে এতটা প্রসারিত করতে চাইছে জীবন !
তারপর যেন আর কোনো বিভাজন নেই
দেওয়াল সচিত্র প্রকাশে বিস্তীর্ণ পূর্ণিমা ----
এই একাত্ম রূপ কি আলাদা হয় ?
সমস্ত দেওয়াল জুড়ে আজ
সে গভীর রং লাগিয়ে দিয়েছে ......
৩৭.
সমর্পণে
কোথাও কি পাপ আছে ?
অন্তরাত্মার আলিঙ্গনে
লজ্জার প্রসঙ্গ আসলে
ঘাবড়ে যাই । তবে কি সুদূর বলে
কিছুতেই আর কিছু নেই !
স্বপ্নে কি ছুঁয়ে যেতে পারে না
জ্যোস্নারাতের জলতরঙ্গরা .....
তাহলেও কি হাতটি রাখা যায়
অন্তরাত্মার উৎসমূলে !
ভাসতে ভাসতে কেউ যদি
প্রত্যক্ষ করেই
কারো গভীর তৃষা ;
কেউ যদি জল- চাঁদ- মেঘে
গড়াগড়ি খায় , বাদাবনের নোনাজলে ,
গান শোনাতে চায় কাউকে ; তুমি তাতে
এত পাপ খুঁজে মরছো কেন ?
সে যে এত ছবি খামে ভরে পাঠালো
সে যে তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতে
শব্দের গেলাসে দিলো চুমুক , তুমি কি আর তাকে পাঠাবে না
সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ভেঙে
স্তব্ধতার আলিঙ্গনাবদ্ধ পাথর মূর্তিখানি
একবারও !
বাতাসে বারুদ-গন্ধ
বাতাসে বিচ্ছিন্ন হানাহানির মৃত শরীর ;
বাতাসে তো লোভ আর লালসার
আশাবাদী ছলনা ;
এসময়
কেউ যদি একটুখানি দেখে ফেলেই
অসম আনন্দের ছবিখানি,
নানা প্রলাপে ভেসে যেতে চায়
মাঘী-পূর্ণিমার নোনাজলে ;
একটি চাঁদের ভেতর লক্ষ করে
লক্ষকোটি চাঁদের তরঙ্গ ----
তুমি সেই জলরেখা ভেঙে , মুহূর্তের উচ্ছাসে
দাঁড়াবে না রাধা নামের কলঙ্কে
আর একটিবারও !?
সমর্থনে কোথাও তো
লজ্জার অস্তিত্ব খুঁজে পাই না !
৩৮.
গান তো আমি গাই না
গায় , সেই
নির্জন রাতের তারারা----
সেও
সেই সুরে আকাশ জুড়ে দাঁড়ায়
বিভঙ্গ মুদ্রায় ।
এরপর বনজঙ্গল-----পাহাড়----মেঘ
একাকার করে
হৃদয়ে আমার !
কান পাতো
শুনতে পাবে
তার পায়ের কান্না ;
মুদ্রা তুলে ছড়িয়ে পড়ছে
কতটা রাতের শিশিরে... ;
আমি তো রোজ তার
পায়ের পাতার উপর থেকে
চোখের জল তুলি
দু'হাতে ;----
কাটা-ফসলের মোথায় গড়াগড়ি খেতে দেখি
তার সমস্ত রাতের প্রলাপ ----;
গান তো আমি গাই না
গায় সে
আমার গলায় ।
গান তো জন্মের অন্ধকার থেকে
আলো খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়
জীবনের সুরে ----
কেউ কেউ পায় ,
পায়, সে মহার্ঘ্য ?
জন্ম তো জন্মে জন্মে
কতবার এলো আর গেল .....
কেউ কেউ জানে
কেউ কেউ জানতে পায় সেই কথা -----
তবু তা সবটা নয়
সবটা পেতে
সবটা দিয়ে দাঁড়াতে হয়, সেই মুর্ছনায় --
যেখানে
সবটাই মুক্ত-বিহঙ্গে চলেছে ভেসে ......
৩৯.
কোন নামে ডাকবো
সে তো সাতচল্লিশ থেকে
একাত্তর,
সাতষট্টি থেকে নব্বই ,
ছয় থেকে একুশ ,
একই বিচ্ছিন্ন নদী
পাহাড় ঘাসজঙ্গল ভেঙে শিউলি ছড়ালো .....;
আকাশ টুকরো হয়ে পড়ে আছে চাতালে ।
পুবে পশ্চিমে
বেলা পড়ে আসে একটি রেখায় ।
পশ্চিমে পুবে
কেবলই অসম আকাশের ঘোর।
খণ্ড খণ্ড মেঘেদের কারুকার্যে
ক্লান্ত--- ধ্বস্ত---
একটি মুখই সকল মুখের ভেতর !
রাতের জানলায় অন্ধকার পথ চলেছে ছুটে.......
ফেরার মনকেমন জানে না
পথের পাশে কারা এসে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ ।
এই পর্যটন
পর্যটন না ----ঠিকানা যেমন ঠিকানায় নেই স্থির---- ঘর কে যেন ঘরের মতোন
দেখতে এসেছিল বলেই
বাড়ি ফেরা ভুল হয় কেবলই......
বাড়ি কি একবারও বাড়ির দুয়ারে
দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলতে পারলো , ওই তো ঠিকানা ঠিক করে দেব বলে
আজ তাকে ভোরের আকাশ
স্পষ্ট করে দেখাবেই ------
তাকে আর মিথ্যে জ্যোস্নায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না
কারো গালের স্পর্শ পেতে -----
৪০.
আড়ালে দুলতে চেয়েছ বলেই ,
এই রোদে চেয়ে থাকি---
ঘামতে চেয়েছো
বলেই........;
শীতরোদ মাখামাখি জানলায়
ডানা গুটিয়ে আসলো উড়ে ......
ঘুরে ঘুরে প্রলাপ শোনাই ---- আলোর অর্থ বোঝাই ---- সামর্থ নেই যে, হারাই
তাই কি যখন তখন পাঠাই ছবি ?
ভাবি , এটা নয়, ওটা নয় , তাহলে তাইতে ;
বাইতে বাইতে
যাই চলে ,
পাই আর না পাই
ধাই সেই সুরে ----
ঘুরে ঘুরে যে জ্বরের ঘোরে কাঁপলে তুমি
তাই চুমি ,
এ বৃক্ষ - কথার ব্যাথার ঘোরে
তুমি শোনাও গান যদি,
দানের প্রাণে বাজাই হারমনি
জানি জানি
উচ্ছাসে নেই বিশ্বাস
তাই তো আড়াল
তাই তো রোদ
গুটোনো ডানার ভেতরে রাখি
মুখটি আমার -----
জ্বরের ঘোরে প্রলাপ পাঠাই
কার শরীর যায় ভিজে আজ ----?
৪১.
এই শীতরাতের কুয়াশায়
কে যেন ডুবিয়ে রেখেছে তার শরীর----
কাঁকরে পাথরে ধুলোয় মাখামাখি সেই মুখ ,
ঝাপসা ; পথপাশে দাঁড়িয়ে
ও কী , বৃক্ষলতা
না কি কারো ছায়ামেঘ সরিয়ে
চলে যায় কেউ
রাতের একান্ত সংলাপগুলি সে সব ।
সারাটা পথ আজ সে গোপন শরীরে একান্ত অন্তরটি ডুবিয়ে
পাখা মেলেছিল যেন ;
তার ডানার শব্দের অনুভব
পাঠিয়েছিল পশ্চিমের আকাশ আমায় ;
পাহাড় পাহাড়ের ওপারে ডুবে ছিল
কাকে নিয়ে যেন -----ছিল না পলাশের বনে
হাওয়া মুখের চলাচল ; বাতাসেরা কাঁদাচ্ছে
বুঝি , অনেক শীত রাতের চাঁদেদের ......!
একটু একটু করে মিলিয়ে যায়
আমাদের অনুভবের ভেতর
অনেক প্রিয় ভূমি-কথারা -----
তাঁকে তার মতো করে চিনিনি যে কেন ,
চিনেছি কি তার অন্তরবিষাদ ?
শীতরাতের কুয়াশায়
কাঁকড়ে পাথরে ধুলোয় যে পথটি চলেছে
তার সাথে ঘুরে ঘুরে
চলেছে ছুটে ..... আমিও কি তার সওয়ারী হই ---- !
রাতেরা ফুরোয় কত রাতের সুখতারায় ডুবে ডুবে ----- ভোরের দেখা পায় বুঝি
কখনও কখনোও ! সেই সব রাতেরা যখন
একা একা ফুরোয়, ফুরোয় পথে পথে .....
মুখটি কার যে বুঁজে আছে
ওই দূরের পাহাড়ে !
বাসি চাঁদে গড়াগড়ি খায় কে ও !
আকাশটাই বিছানা বিছিয়ে ছিল যেন কারও
সেই অস্তসোহাগে......!
৪২.
রাত তো একার না !
অনেক কথারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে
প্রিয় অপ্রিয় মুখে -----;
তার ভেতরে অনেক আকাশ ভাসে ।
আমাদের সকল সময়
সময়েই নেই -----
সময় আপন আনন্দেই পাগল হয় ।
কাঁদেও ----
সে কান্নার শব্দ তুমি শোনো নি কখনও !
সে কান্নার নুপুর বাজে
কোনো এক নির্জন রাতের পায়.....
তুমি কি সেই
কুয়াশায় কুয়াশায়
পাহাড়ের নিচু ঢালে
অনেক বসন্ত ফোঁটাও...... ;
চিঠি পাঠিও
পলাশে পলাশে কথা হলে, দুধারী পথের হাওয়ায় ------ কারা যেন রঙিন হতে চেয়েছিল সেবার ----
রাত তো একার না
প্রিয় অপ্রিয় সুখে .....;
৪৩.
সব অপেক্ষার আকাশকে
একদিন ঘিরে ধরবে সাদা মেঘ ;
সেদিনও রঙে রঙে আরো রঙিন হবে পলাশেরা ---
মাটি আর ফুলে
কথা কওয়াকয়ি
শেষ হবে না কি কোনোদিনও?
এই নিঃসঙ্গতার কথা শোনে কে আর কতকাল !
সে প্রকৃতির প্রলাপ
শুনতে পায় ক'জন আর কানে ;
অনুভবের স্মৃতি দিয়ে
তাকে শুধু চেয়ে দেখ একবার অন্তত ,
সেই সব আকাশকথাদের ;
হাজারো বর্ণময়তায় চলে যায়
যে চোখের আড়ালে
আমাদের অদেখা দৃশ্যগুলো ....!
( চিত্রশিল্প : পর্ণা দাশগুপ্ত মিত্র )

No comments:
Post a Comment