পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে
দীপংকর রায়
উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস
১৫২.
মিছিলে হাঁটতে দেখনি বলে
—-- মুষ্টিবদ্ধ চিৎকার শোনেনি
কেউ ।
দেখেনি পেছনে
ভিড়ের ভেতর কেউ একজন
ছিলো —--- হুমড়ি খেয়ে
পড়েছিলো অপরিচিত ফুটপাত জুড়ে
রক্তাক্ত গোঙানির শব্দ ; দলছুট বেওয়ারিশ লাশ হয়ে ।
চেননি তার ভাষা । বোঝোনি কোনো ইঙ্গিত।
সে যে কতদিন ধরে
অবহেলিত নিস্পেশিত ছায়ায় ছায়া গিলে চলেছে ,
সে কথা জানার ও বোঝার আগেই
তির্জক কিছু ছাইএ লুটিয়ে মুড়িয়ে যে মোড়ক খুলেছো
তার রসনা এমনই , জানতে দেয়নি , কৃশ শরীরের উজ্জল্য কোন দিকে মৃয়মান সূর্যাস্তের মিহি আলোয় আলো হতে হতে সান্ধ্য কিত্তনের সোরগোলে মিশে গেলো ….?
মঞ্চজুড়ে মিশে গেলো যখন আস্তিক নাস্তিক - বৌধিক - কপট —--
মিশে গেল ক্ষমতা ও অক্ষমতাদের লাম্পট্য ঢাকা দেওয়া মুখের সারিরা — আর কিছু চেনার নেই । জানার নেই । শব্দে শব্দে জুড়ে, যত দূর চোখ যায়
হাসির রোল ওঠে ; ঠগ ও ঠগিদের ঠনঠনানো চিৎকার শুধু ?
ওহে বোকা হাঁদা , নিতান্ত কায়দাটুকু চেন , তা না হলে এত পেছন থেকে তোমাকে দেখবো কেমন করে ?
অপরাজেও এই সব হীতকারীদের দলে অপাংক্তেয় থেকে গেলে যে ;
এখনও সময় আছে
মিছিলে নাম লেখাও , সদস্য পদ চাই তো ! তাই না হলে
কী করে বলি , তুমি ছিলে, তুমিও ছিলে তো —-- !
১৫৩.
—- সেই তো জলের দিকে গেছিলে বলেই , এতো জন্ম আমাদের ধংসের দিকে মুখ করে দিলো ;
—-সেই বলে একথাও বলছি না ,
তুমি পা ভিজিয়ে দাঁড়াবে না জলে ,
অবশ্যই দাঁড়াও ,
সঙ্গে নিয়ে যাও অনেক আগুন —--
যা থামলেই অনর্থের ভাষা , সকল উদ্ভাসিতের প্রকৃত চিনবে ?
চিনবে সেই পরমার্থ ,
যা তাঁর তুষার এ ঢেকে গেছে !
যার ক্ষয় তুমি মিথ্যায় থরে থরে সাজিয়ে রেখে যাও
বলেই , আমাদের সকল ধংস প্রকৃতোয় অনুবাদ হয় না । দুর্বোধ্যতায় ঢেকে যায় অনেক কুয়াশার মুখ ;
সকাল কে সকালের মতো চিনি না
দুপুর কে ;
সন্ধ্যা আসে ঘুম চোখ খুলে
রাত্রির নীবিড় নেমে যায় সমুদ্রের মতো …….
যাও, যাও আরো জলের কাছে
দাঁড়াও ভাগ করে সকল পরিভাষার মুখ , একটুও বিচলন নেই ,
বরঞ্চ , তোমাকেই অনুবাদ করতে করতেই , জীবন ফুরায় যতো …
তোমার ঢেউ চিনে ওঠাতে একটুও বিভ্রান্ত নই ,
যেন বুঝি ; তাতে অনেক দুর্বোদ্ধতা ছিলো বলেই, তুমি এত রোমাঞ্চের অধিকারী ……?!
১৫৪.
উৎসব , উল্লাস , হুল্লোড় থেকে
বহু দূরে আগলেছি
সমর্পণের সকল ভনিতা ;
শুধু কি তাঁরই দায়বদ্ধ লালনপালনে ?
স্বাদ জাগে তাও।
জিভ কে বশে আনা
বড়োই দূর সাধনার ফল ;
উচ্চারণ মুখস্থ করি ,
শুনি তার ও তাঁর চিৎকার দিকে দিকে
যেই ,
সেই দ্বিতীয় র দরজা খুলে ছুঁড়ে দিই
সকল অঞ্জলি -----
না না বল্লম নয়
নয় বাইরের যুদ্ধ
এখন প্রয়োজন আত্মশুদ্ধির । প্রয়োজন বড় নির্জন একটি দিগন্ত নোয়ানো প্রান্তর শুধুই;
আর একে অন্যের মুখোমুখি চোখে চোখ কিছুক্ষণ !
চলো , চলো যাই চলে
রাতের ট্রেনে
হু হু হাওয়া যেদিকে চলেছে ভেসে
সেই দিকে , যেখানে একটি ঝোঁপের মুখে , সকল নির্জনতা ছড়িয়ে দাঁড়িয়েছেন
তিনি একটুখানি
আলো হয়ে
সেই জঙ্গলের গলিপথে ......;
অপেক্ষা করো ।
দেখা পাবে তুমিও
তাঁর
যাকে খুঁজে চলেছো
মেলার মাঠে , এতো সংএর ভিড়ে !
১৫৫.
সকলের দেওয়া আড়াল
গ্রহণ করি আমি ।আমার
ছায়াকেও ঢাকি
তোমাদের লম্বা শরীরের আড়ালে ;
কোমরের গুপ্তিরও ধার চিনি , চিনি বলেই বুকের ভেতরের এইটুকু শ্বাসকে আটকে রেখেছি ,
যাতে অন্তত বাঁচার দমটুকু পাওয়া যায় ,
যে ছায়ার আড়ালে লুকোতে চাই না কেন সকল উঁচু শাখাতেই গাছ নেই
শুধুই গাছের আকৃতি , শুধুই নকল শরীরের উপর নকল মুখ বসানো । তুমি আমাকে কোথাও বাঁচতে লুকোতে দেবে না যে সে কথাও
জানি ।
এই জানা ও চেনার মাঝেই আমার রক্তাক্ত দিনাবসান হয় -----
১৫৬.
অনেক উচ্ছাসের আড়ালে তাকিয়ে চমকে উঠি না
ভাবি , উপহাসের ইঙ্গিতগুলির বর্ণ কেমন হলে তোমাকে আলাদা করা যায় ,
বটবৃক্ষের নিচে দিয়ে হাঁটতে হয় আমাকেও ,
আমাকেও চিনতে হয়
বট-পাকুড়এর ব্যবধান । চিনতে হয় কোন কোন ঋতুতে
শান্তিনগরের পথে পথে সেই যে ছাতিম ফুলের উগ্র ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে ;
উৎসব দিকে দিকে মুখ উঁচিয়ে মিচকি হাসে ,
তাই বলে কি এই পথে হাঁটতে বারণ করছো তুমিও ?
মন কেমন করলেও সত্য তো সত্যই ;
মন কেমন করলেও দেবীর দশ হাতের আশায় বুক বাঁধতে ই হয় -----
নিয়তি যদি ধরেই নাও আমার ব্যার্থ উৎসর্গ কে , ধরেই নিও
সঙ্গে সঙ্গে একথাও ধরো
মহাপ্রস্থানে চলেছি যখন তখন অনিবার্য তো আছেই !
যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে এত পরাজয় ছিলো বলেই
বিশ্বরূপের মহীমা এতো !
১৫৭.
সংশয় জাগছে কেন এত ,
সন্দেহ ই বা কীসের ?
এই তো মাতৃগর্ভ থেকে পথে নেমছো
এর ভেতরেই
এত গুলি দিনের উৎকন্ঠায়
প্রশ্ন চিহ্ন তুলে দিলে ?
সেও যদি দরদী
জিজ্ঞাসায় বিগলিত হতো তোমাদের উৎকন্ঠা;
প্রশ্ন তো অনুসন্ধিৎসু চোখের ;
প্রশ্ন তো উৎকন্ঠার ;
প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসা চিহ্নের আকৃতি জুড়ে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়েছেন যিনি , তিনি তো গ্রাম্য পরসি যেন ; চোখের চশমা ঝাপসা
তবুও সত্যটা জানতে এসেছেন ,
কী মজা তার !
প্রত্যক্ষদর্শী তুমি তো ?
বলোই না কেন ,
কী এত মজুত ভাণ্ডার আছে তার
না হলে কী করে পারেন এভাবে জীবনকে বিলাতে
পথে পথে.....!
বড় হও , আর একটু নুব্জ হোক ছায়া
জানতে পাবে
কিছু কিছু জীবন এমনই থাকে ;
মাপা যায় না আপাত কাপড়ের ফিতেয়
সেই জলের গভীরতা কতটা হলে
তুমি অন্তত নিশ্চিন্ত হতে পারো !
১৫৮.
খোয়ারে ফসল খাওয়া পশুদের পুরে দেওয়া ছিলো গ্রাম্য রীতি ।
ওমা ! একী ! এও যে দেখছি শুয়োরের খোয়ার দিকে দিকে
পারলেই তুলে এনে
ছেড়ে দেওয়া হয় ।
তুমিও যাবে নাকি ?
ওই তো খোয়ারে একটা আন্দলোন দানা বাঁধছে শুনছি ;
তাতে কে নেই
সাদা কালো হলুদ নীল সব রঙের সমাহার একটি খাঁচার ভেতর জটলায় মত্ত ;
তুমি ও ঢুকতে পারো
যেতে পারো তুমিও
কী সব আলোচনা
পারলে রাজা উজির নাজির বধ শেষে
যার যার হিসেবের খাতায় দাগ দেওয়া আপন নামের বানানটি-ই ভুলে যাওয়া -----
১৫৯.
তুমি যে এসেছিলে অবহেলায়
এ কথা ভুলে গেছো ।
ভুলের উল্টো দিকে
দাঁড়িয়ে আছে
সেই সে এক চাওয়া ;
যে চাওয়ায় হাত নেই
অথচ
অনেক হাতের হিজিবিজি রেখাদের নদী
দেখেছ কি চেয়ে ?
ভালো করে
দেখার কথাটি যদি ভাবতে
তাহলে এতটা দারিদ্র্য
ধরা পড়ত না
ধরা কি তুমি দিতে চাইতেও পারো
না ধরা পড়ার কৌশল আয়ত্ত করেছ বলেই
বোকার দলে
আমার নামটিও লেখাতে চাও
ভুল এখানেই ।
কারণ হারাতে হারাতে জেনেছি
হারানোর মহিমা কতটা সুন্দর হতে পারে কারো কারো একলার পথে ;
এই সুন্দরের স্বরূপ
জানতে হলে
সকল ভোরের আলোয় দাঁড়াও একবার
দেখবে তিনি প্রকাশিত হচ্ছেন কীভাবে
তার পর এই জন্মপাপের আর কোনো অস্তিত্বই নেই ।
তুমি ফুল হয়ে গেছো ।
তুমি শূন্যতার সকল স্বরূপ জেনে
সঠিক কবিতায়
এই জন্মের সব জঞ্জাল সরিয়ে
শুধুই ঢেউ হয়ে গেছো
ঢেউ......
১৬০.
তোমাদের স্বীকৃতির দুয়ারে জোড় হাতে দাঁড়াই নি কোনো কালে । তাই বলে কি আমার বলাকে
বাকরুদ্ধ করে দেবে ?
এই কৌশল , বন্ধুত্বের ছলনায়
এমনই একটি ফাঁদ রচনায়
মেতেছো ?
তাও
পেতে দেবো বড় আসন ।
মায়ের সূচি-শিল্পের নিদর্শণ বোঝাতে ;
বোঝো আর না বোঝো , বিগলিত নাই হতে পারে
হৃদয় তোমাদের ;
কটুক্তির বর্ষা ঝরাতেই পারো ফিরতি
মজলিস জুড়ে ;
তবু আমার আভিজাত্য বোঝাতে
নিরেট মাথার ভেতর পুরে দেবই ----
না , আমি কারো স্বীকৃতির অপেক্ষায়
এই উন্মাদনায়
সর্বস্ব খোয়াতে পথে পথে নিঃসঙ্গতার গান গাই নি ।
আমি আসি
একাকীই চিরকাল ...
১৬১.
আমার মুখের দিকে কত সত্য যে চেয়ে আছে !
তাদের সকলকে চিনিনি হয়তো
তবু তারাই জাগায়
তারাই ঘুমের ভেতর কথা বলে ....
আমিও তাদের হাত ধরে কত সব দেশে ঘোরাঘুরি করি !
তারা একটা একটা করে সম্পর্ক ভাঙে একটা একটা করে গড়ে তোলে ;
কত সব হামাগুড়ি ,কত সব দিক পরিবর্তন চলে ;
জামায় কাপড়ে ফুলে ও ফলে আমায় সম্পূর্ণ করে কোথায় মেলায় যে ,
এত খুঁজে খুঁজে ও তাকে ধরতে পারি না
শুধুই ছুটি .......
যে সব ঘোরের ভেতর এই সব
ওঠা নামা চলছিলো
তাদের একটারও
মুখ মনে রাখতে পারি না ।
বসে থাকি । স্থির চেয়ে থাকি দেয়ালের দিকে , মেঝেয় ,
বিছানার চারদিকে ঘুরে ঘুরে
একসময় বলি , জীবন কি এমনই
একটি রাতের বিছানায় এলো আর গেলোই শুধু ....?
আজ কোথাকার অতিথি আমির
জীবন্ত একটি চরিত্রের মানুষ জন্ম ফুরোলো।
একাত্তরের সেই বীর স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষোক চিরনিদ্রায় চলে গেল ......
সব স্বপ্নের ভেতর !
জীবন ও স্বপ্নের ই একটি পর্বান্তর শুধু ----
১৬২.
যেটুকু সময় নিজের সঙ্গে থাকি
সেইটুকু ই জীবন
বাকিটা মানিয়ে চলা
এই কিছুক্ষণ আগেই মানাতে যেয়ে
বেমানান হয়ে পেছন ফিরলাম ।
চাওয়া পাওয়া নিয়ে মানানো তো নেই ,
ছিলো কিছু স্মৃতির দায় ,
যে কারণেই
গলাগলি ঘোরা .....;
সেকি !
সেখানেও দেখি উল্টো ছায়াবাজি , তা ধিন না ..... তা ধিন না.... তা ধিন , তা ধিন ....
চরকিবাজি ঘুরতে ঘুরতে ঘরে ফেরা ----
কবিতার গুষ্টির পিণ্ডি চটকে গেলো , ভদ্রতার মুখোশ খুলতে না পেরে
এক লাথিতে সকল সম্পর্কের ছায়া উল্টে দিলাম কষে এক লাথিতে ;
তবুও কালি মুছলো না নিজের গালের ?

No comments:
Post a Comment