Thursday, January 26, 2023

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

দীপংকর রায়‌

উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস




১৩১.
এই অহেতুক চলাচল
প্রশ্ন জাগায় যে
সেকথা জেনেই
সেই সব প্রশ্নবোধক চিহ্নে 
একবার হলেও 
জিলকে উঠেছিলাম !

দুহাত পেতে দিয়েছিলাম ঝিলের কিনারে ,
ভাবছিলাম কখন সে পানকৌড়ির গলায় ডাক দেবে যেন ----

তাইতো রাতের সকল উৎসর্গ , একবার বারবার 
জলের তলদেশ ছেড়ে উঠে এলো !

আমিও সেই রাতের দীর্ঘ লয়ের ভেতর অনেক মৃদু ঢেউ হয়ে 
            যেতে যেতে....
দুই পা ডুবিয়ে কত কথায় ঢেউ হয়ে চলে যাচ্ছি যে 
সে সব কেউ কি জানলো আদেও ?

তার পাতাল বাসেও এই ডাক পৌঁছল না !

সে সব আদেও
কিছুই না ,
এই মুগ্ধতা শত শত জীবনের বিরহ সন্তাপ; একা একার খজ্ঞনী ---- 
এইসব জানতে জানতে কত নীরব জন্মান্তর এলো আর 
                  গেল 
তার একটারও প্রকৃত অন্ধকারের ঘোরে 
আলো হাতে যদি এই দুহাত পেতে থাকি 
            প্রকৃত 
তাহলেও জেনে নিতে পারি কে সে 
কেই বা আমি !

কতবার এসেছি যে 
কতবার ?
কতবার ঝিঁঝিঁদের ডানায় ,
হয়তো জোনাকির ঘোরে কেঁদেছিও ;
একবার 
হাজার বার 
ঘুরে ঘুরে ওই পানকৌড়ির দলে মিশে গেছি সেই সব নক্ষত্রদের রাতে 
শত উল্লাসে বার বার জ্বলেছি, নিভেছি 
সেই দুজনার ঘুম ছিঁড়ে চিৎকার ও করেছি অনেক ;
তবুও পুনরায় তাকেই খুঁজেছি এই জলে ?






১৩২.
তার কথা বলার বৃত্তে 
ভেঙে যায় যেন হাজার হাজার জন্মের রক্ত-কনিকারা -----

বোধের তীব্রতা জেগে থেকে দেখেছে একা একা সে সব অনেক ---- 
তাই তো উৎসর্গের মুদ্রায় নটরাজ হই ;
পাহারের কাঠিন্য ভাঙি পায়ে পায়ে !

কাঁকরে , পাথরে জমাট মাটির ভুল প্রতিমা দেখি সাজছে 
 ‌        কেমন একাকী ;

জাগিয়ে তোলো ওহে জাগিয়ে তোলো যত ওঙ্কার আছে কূলকুণ্ডলিনী জুড়ে ;

জল হও ,
জলের মতোন ঘুরে ঘুরে কথা বলো 
সব তৃষিত তন্দ্রা ছিঁড়ে; 

হাসবো না 
বলো হাসাবো‌ না 
তার অপূর্ণ নদীর 
  শত চঞ্চলতা ঘিরে !





 
১৩৩.
তার কোনো ছবি নেই যা আছে তা ছবি নয় তা শুধুই চোখের ভেতরে চোখ বোজা কয়েকটি ঝিকিমিকি অন্ধকার ,
সেইটুকু ধরে ধরেই পার করে দিলাম আস্ত একটি সমুদ্রের তোড়ের ভেতরে ভাসতে ভাসতে মিলিয়ে যাওয়া......

তাও কি তুমি বলবে আমি তোমাকে ছুঁয়েছি ! আমি তোমাদের গালের স্পর্শ নিয়ে সন্তান-স্ত্রী-পরিজনের টানাটানির স্বপ্নের ভেতরে তোমাকে ছুঁয়েছি একবিন্দু ও ?

জানি না 
জানি শুধুই তার ঝিলকে বেড়ানো আমার দুচোখ বোজা মুখের আদল,
আর এই ঘুমে চলে 
       যাওয়া রাত্রি .....







১৩৪.
আমার যে চোখের আলোয় তার চারাগাছ দুলে উঠেছিল হাওয়ায় হাওয়ায় ---- 
দুধমানকচু গাছের সতেজতা মিচকি হেসেছিল , কচি কলাপাতাদের ও সে কি হলুদ সবুজ হয়ে ডেকে ওঠা যেন ; 
বিনুনির ঘামে ঘামে কত গান শোনা কান 
দেখেছিল বুঝি বাবুই পাখির সৃজন ;
এসব  কিছুই না জেনে না শুনে সে 
সমুদ্রের নীলে নীলে হেঁটে গেল বহু দূর অবধি ......
তারপর ছাইয়ে ছাইয়ে মুছে নিল আরো খানিকটা যত ছিল পেন্সিল হাতে তার ;
জানি , সেও তার না , সময়ের তোড় খানিক;
তারপর লঘু ছায়ায় ছায়ায় হঠাৎ বসন্তের ডাক ! 
হয়তো হবে , তবুও আমি আজ মনে মনে বার কয়েক ডাক শুনেছি তাদের ই 
যারা তাকে সবুজ হলুদে গড়ে পাঠিয়েছিল দুধমানকচু কলা পাতার রোদে রোদে ....

সে সব কথা কী আর বলবো তোমায় ;
ট্রেন ছেড়ে যাবে 

সেই তো শেষ কথা বলা মানুষের মুখে ...?






 
১৩৫.
আমার দুটি দেশ আছে । তার একটি দেশের বাইরে আর একটি দেশের ভেতরে বিদেশ ।
দেশের বাইরের দেশটির দূরত্ব দেড়শো কিলো।
দেশের ভেতরের দেশটি তিনশো কিলোমিটার ---- 
একটিতে যেতে  সীমান্ত প্রহরীর কড়া চাহুনি , আর একটি তে পৌঁছোতে একটি রাতের পথ হলেও 
দিনের আরাম নেই 
নেই কোথাও কোনো পরমাত্মীয় ---- তবু যাই , পথে পথে ঘুরি , খুঁজি , কী সেই খোঁজা জানি না তো ! তবু যাই , ধুলো উড়িয়ে ,পাথর মাড়িয়ে 
অহল্লারা আড়মোড় ভাঙে পায়ের নিচেয় ;
আমি কি রামচন্দ্র হবো ?
গান শুনি , ছৌ নাচি ঘাড় ঝাঁকিয়ে হাত ঘুরিয়ে তবু আমি কেউ না ।কেউ না , যেদিকে কেউ হয়তো রাতের ছাদে পাক খায় , আকাশের ইশারায় একা একা ?

আমার কোথাও কোনো ঘর নেই । দেশ নেই । অথচ দেশের আকাঙ্ক্ষা থেকে 
এক একটা দিকে ছুটে যাই এক এক ঋতুতে .....

সকলেই পাশপোর্ট খোঁজে ---- 

দুহাত তুলে দাঁড়াতেই হয় , গোপোনে লুকিয়ে রেখেছি কিনা ধারালো কিছু !

আমার কোথাও বস্তুত কোনোই দেশ নেই ।

কোথাকার অতিথি আমি ?







১৩৬.
বাক্যের ঘোর কাটতে না কাটতে 
আমি তাকে প্রিয় ফুলদানি নকল প্রজাপতি উপচানো অরণ্য পর্যাপ্ত পাখিদের আকাশ ভেঙে ডাকতেই থাকি 
সে আর সারা দেয় না 
সে আর পেছন ফেরে না 
কারণ এই যে এত কিছু দিয়ে তাকে গড়েছিলাম একদিন বুকের দোয়াত ছাপিয়ে কলমের ডগায় ,  তাতে তো তাকে  বাক্যের ঈশ্বরী করে ছেড়ে ছিলাম বলেই , সে আর ফেরেনি !

এই ফুলদানি, কলম ,  অরণ্য , এই মাঠের আকাশ , সব তাকে দিয়েই বলেছিলাম 
আরও যা কিছু আছে সব দিয়েই তুমি হয়ে আছো আমার চোখ ,
চোখের ঢেউএর ওপারের সাগর ,
তাও তো ফেরেনি জন্মজন্মান্তরের এই বিরহ না ফেরারই গান, সুর ও সাধনার বস্তু হয়ে গেছে বলেই 
তার মূল্যবান রূপবিগ্রহে এত উদযাপন ?

ভীষণ ভালো লাগলো নদীকেও দেখলে শব্দের খাঁজে খাঁজে বয়ে যেতে 
সমুদ্রকেও  .....?

আমি একটুও বিচ্যুত হইনি 
একটুও নিরুতসাহিত
বরঞ্চ 
ডাকতে শিখলাম আরও
অন্যরকম ভাষায় 

যেভাবে দেখতে ও দেখাতে চাইনি বলেই 
তুমি দেখনি চারদিকে এত হাহাকার ছড়িয়ে ছিল কীভাবে 

যে আঘাতের চিহ্ন ধরা দিল বলেই ,

সেই কলঙ্কিত রূপ আদিগন্ত জোড়া গান শোনালো আজ ,

তুমি মহিত হলে এতো !








১৩৭.
রোদ ছিল কি 
বাতাসে বাতাসে কেবলই বার্তা এলো পথের কথা 
ওগো পথের কথা ঘোরাও ,
ওই দিকে জল ফালা করছে আদিবাসী ছায়াযুক্ত একটি বেলা  ;
আমরা এই দিকে ,
ছবির মহড়ায় ঘুরছে কার যেন আঙুলের উপর অনেকটা বিষাদ ; 
সকলের গলায় সুর থাকে না 
তাই বলে ওই ঘুঘু দুটি একে অপরকে মাঠের কোনে ডাকবে না 
আপন কথার সুরে 
তাই কি হয় ?

পথ বলছিল 
সব কথাই কথার কথা ; এই নিয়ে তুমি কেন আর একবার চাইবে না 
যেদিকে ঘুরতে ঘুরতে পথ আপ্যায়নে অস্থির করে তুলছে 
বলছে , একটা অন্তত খবর দিয়ে তো আসতে হয় , আমারও তো কিছু করনীয় থাকে , তোমার জন্যে !

চলো , ওই দিকে তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসি , শেষ বেলার জলে স্নানরত পানকৌড়ির ডুব আমাদের সকল কথা বলা ?!







১৩৮.
মিথ্যা চারদিকে ঘুরতে থাকলে
সেই ঘূর্ণির ভেতর থেকেই  
চক্রবুহ ছাড়িয়ে নিতে 
শেখা ,
সময়ের দিকে চেয়ে নয় 
সময়কে আঙুল ছাড়িয়ে 
অদৃশ্য সত্যের ধ্যানে চলমান থাকা 
সেও যেন তখনি 
কথা বলে 
যখন তুমি খোলস ছাড়াতে 
শিখে নিয়েছ উত্তাপ থেকে 
একাকী
তারই দেওয়া নির্জনে ----

যা কেউ না জানলেও 
বাতাসের সকল ঢেউ কখনোই অস্বীকার করে না ।

অর্থাৎ মায়াহীন অনিবার্য আয়ত্ত করেছ বলেই 
তুমি অপরাজেও অভিমন্যু ----






১৩৯.
কেন এত বিষাদ জেগে থাকে ?
চারদিকে চেয়ে দেখ ,
ওই তো তোমার সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে 
যা কিছু একদিন চলতে চলতে দেখতে চেয়েছিলে ,
ওই দিকে তারই মতো সেই তো দৌড়ে গেল --

তাও কি সে নয় ?
ওই তো টিলা পাহাড়টি কতকাল কত রোদ আলো মেখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে 
কত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই মায়া মেখে ;
কত সন্তান পিতা হলো, কত পিতা প্রপিতামহ হলো , কত ক্লান্তি ধুয়েমুছে চলে গেল কত প্রাণ 
প্রেম এলো 
প্রেম চলেও গেল 
কত জীবন নতুন পুরোনো হলো ,
তবুও তুমি এলে তুমিই গেলে যেন এমনই
কতবার 
তবুও একই জিজ্ঞাসা
শেষ হলো না কখনো 
চলতেই থাকলো 
চলতেই থাকলো 
জীবন শেখালো কি 
না আজই তুমি শিখলে , এখানে কেউ ছিলো না তো 
কেউ ডাকেও নি 
তবু তুমি এসেছিলে 
দাঁড়িয়েছিলে 
ভেবেছিলে 
হারিয়েছিলে কি কিছু ? নিয়েও যেতে পারো নি 
তবুও অদৃশ্য দুটি হাতের স্পর্শ পেতেই 
যেন কতকাল 
কত জন্ম তুমি আসো আর যাও ----








১৪০.
অনেক কথার পরে স্তব্ধতাই চেয়ে থাকে মুখ জুড়ে ---- টিলা পাহাড় টিও গুনছিল রোজ কারা আসে কারা চলে যায় সাইকেল চালিয়ে কিশোর কিশোরীদের পায়ে পায়ে ......

আমি কি একবার শুনবো ওহে বাড়ি ফেরার ক্লান্তি নিয়ে আজ তোমরা কী কী মুখস্ত করে বলে এলে , আমাকে বলবে কি একবার ?

আমি পথ হারাই নি ,
চেয়ে আছি তোমাদের অনেক স্বপ্ন দেখা জীবনের দিকে ......

বলো বলো , আমি শুনতে চাই 
বেলা ফুরিয়ে এল আমার , ওদিকে আবার যেতে হবে 
কথা নিয়ে চেয়ে আছে কত অপরিচয় আমার জন্যে যে , ওসব বোঝার জানার সময়ের কাছে এখনি কোনো জিজ্ঞাসা রেখ না যেন , 
সান বাঁধানো পথিক নিবাস জানে না 
কোথাও যাবার নেই 
ছিলোও না 
তবুও চলে গেছিলাম 

কেউ একা হতে পারে না যেন , সকলের ই দোসর থাকে ওই অজানা পথের উপর অদ্ভূৎ ছায়া জড়িয়ে ----- 

যে ছায়ার কত অপরিচয় 
সমস্ত জীবন দিয়েও যে পথের কোনো কথাই জানা হয়ে ওঠেনা ঠিকঠাক ।







১৪১.
দেখতে দেখতে কতটা অনিবার্য 
গিলে খাবে এ কথাই আজকাল 
এই অঘ্রাণ এলেই 
মনে হয় ।
বহুকাল আগে 
তাকে মনে করতাম 
নলখাগড়ার বনে ।
বহুকাল সে সব সেরে 
ফিরে এসেছি 
একথালা গোবিন্দভোগ চালের 
গন্ধে , কয়েকটি দুব্বা ফুলে  ;
যেসব আঙুল সে সব  মনে রাখতো ,
যেসব দিনে এইসব বিশেষতঃ উলুধ্বনি শাঁখে প্রদীপে ঘিরে ধরে জানান দিতো 
এই এতবছর ;
তারা আর কোথাও নেই 
আছে শুধুই বয়স ,
ছোটো হতে হতে দিন দিন আমি এতটাই 
বড় হয়ে গেলাম ,
আজ আর নলখাগড়ার বনে কোথাও 
যাবার নেই আমার ।

নৌকাগুলো বহু দূর থেকে 
জল সাঁতরে ছুটে আসে তবু আজও ----

আমি কত অনিবার্য জুড়ে এঁকে তুলি 
সেই সব মুখমন্ডলের ভেতর কত উৎসবের মুখ ----- 


জিভ জানতে চাইলেও‌ উত্তর পাই না 
প্রকৃত উল্লাসের স্বাদ আর কোথাও
আছে কি নেই -----


চারদিকে এত হাতে তালির শব্দ শুনি 
তবু আমার কোনো উৎসব নেই । উদযাপন ও ছিলো না।
ছিলো যারা আঙুল জড়িয়ে
তাঁরাও বহু দূরে চলে গেছে আজ ......

অনিবার্য এমনই ?

তবু নৌকো চলে 
চোখের আলোয় ডিকবাজি খেতে খেতে ...... কে আজ পাঠাবে সেই বার্তা
সেই অনিবার্য ভুলে !

তারই অপেক্ষা যায় না 
সময় ফুরায় দেখি ,







১৪২.
অঘ্রাণ ফিরে যাওয়ার

অঘ্রাণ ঘুরে এসে বিদাই জানাবার দু' একদিন আগে আগেই 
আতঙ্ক ঘিরে ধরে ।
রোদের দিকে চাই ।সন্ধ্যার আগে আগে যেভাবে প্রদীপে তেল ঢালে গৃহিণী হাতের ব্যাস্ততা 
আমিও সেভাবেই তটস্থ হয়ে পড়ি ,
শুভেচ্ছা বার্তা আসে জনে জনে ----
আজ আর তেমন কেউ নেই 
যে দিনের আলোয় 
প্রদীপ জ্বেলে অপেক্ষায় থাকবে 
আমার কর্মব্যাস্ত দিনের দিকে 
তবুও কেউ কেউ থাকে , কেউ কেউ 
যারা আজও আমাকে ঘিরে সংসার সাজিয়েছিল হয়তো ;
আপনজন কত জন আছে ?
আপন আপন পথে 
প্রদক্ষিণ রত ?
সত্যিই কি আমরা কেউ কারো আপন হতে হতে সকল সংক্রান্তি গুনি একবারও ?


অঘ্রাণের এই সংক্রান্তির দিনটি আমার চারপাশ জুড়ে নৌকোবাজ ছোটায় আজও , আমিও তার মাস্তুলের ডগায় বিদ্ধ হই এমন সব বিগত দিনের কথা ভেবে ভেবে ,
যার পর আর কি মনে থাকে ইতুর গান 
আর কি মনে থাকে কে কে অপেক্ষা রত ছিলো , কে কে পাঠিয়েছে আমার এই বিদ্ধ বেঁচে থাকায় 
মঙ্গলবার্তা দুই এক পঙতি ?!







১৪৩.
নিজস্ব নির্জনতা ধারণ করতে পারার থেকে বড় ধ্যান 
আর কিছুতেই নেই ।
যদি তার অভিমুখ
বিদ্ধ করে অহম কে ।
যদি নস্যাত করে অসহিষ্ণু মনের আত্ম-ধংস কে ।তবে তার থেকে বড় সহিষ্ণুতা 
আর কিসে অর্জন করা সম্ভব ?


তাই ফিরেছে যখন বহতা স্রোত আপন কেন্দ্রে 
ফিরেছে যখন চাঁদ টলতে টলতে নেশা ভেঙে 
শেষ রাতের স্রোতে 
ওহে 
কে কোথায় আছো উলু দেও 
কাঁসর ঘন্টায় আরতি সাজাও 
দেবী এসেছেন 
দেবী দাঁড়িয়েছেন 
নিজের লজ্জা ভেঙে আপন জিভে ,
কোথাও অবশ্যই আছেন তার মহাকাল 

জোতির্ময় আলোকে তাই তো লিখি আজ 
আঁধার আলোকলতা 
আঁধার আলোকলতা !


 




১৪৪.
শরীর বস্তুটি জানান দিচ্ছে হয়তো ;
সারাদিন বিছানায় ।
কাতরাতে কাতরাতে ভাবছি , এই তো গতপরশু অমল চলে গেল ।
অমল , বিশেষ উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় কেউ নয় --- অমল‌ শুধু ছেলেবেলা ।
অমল , কখনোও কখনোও বেশ মানবিক । অমল কখনোও কখনোও এতটাই অন্যায় সমর্থক , তবু অমল আমার কাছে একমাঠ গোল্লাছুট ।অমল দাড়িয়াবান্ধা।অমল হা ডু ডু , অমল কাঁচের গুলি চেলে দিত 
আলাদা এক ঢঙে.....


এইসব নানা কারণে অমলের অকালে চলে যাওয়া ,  মনে করালো অনেক টা সংসারের বাইরের যাত্রাপালা ।


অমল চলে গেল বলেই আমরা তাঁকে মহান করে দিলাম 
জাগতিক যুদ্ধক্ষেত্রের থেকে অন্যায় সমর্থণকারী বলে 
সে কথা না । অমল কে মনে রাখলাম 
গোল্লাছুটের মাঠে ।
অমলকে মনে রাখলাম দাড়িয়াবান্ধা হা ডু ডু 
কাঁচের গুলির ভেতর নানা রঙের ফুলের পাঁপড়ি রঙের ভেতর ।

অমল এখানেই 
সকল চলে যাওয়া কে জয় করে 
হাসতে হাসতে মাঠ ভেঙে শুধু চলে গেল 
খানিকটা দূরে .....







১৪৫.
অদৃশ্য কখনোও সামনে আসছে 
দৃশ্যত কিছুই না দেখা গেলেও চোখ পাল্টাতে যেয়েই ভেবাচেকা! সে কি !...ওখানেও ছদ্ম সৌজন্যের এত ঝাঁপি ! 
একটুখানি ফাঁক হতেই বাতাস কোপানোর শব্দ ! একটুখানি সহমর্মিতার দিকে হাত এগোলেই , কি গভীর ভদ্রমহদয়ের হাতজোড় সৌজন্য! মনে হয় যেন এই বুঝি ঝুঁকে গেছে সমস্তটা শরীর তার ব্রীজের থেকে ; 
তাই কী আর করা !
পথ পাল্টাই 
দেখি , আজ কী কী অভিঘাতে শতছিন্ন পড়ে আছে সকল সম্বিত ?
উত্তরের ঘরে অনেক নৈঃশব্দ! নাগরিক ,নাগরিক কেলোয় ধরেছে সকল পথের মোড় ; 
তাতে কি , তুমি হাঁদা রাম হয়ে লেজ নাড়ো যেখানে যতটুকু ঘাড় কেলিয়েছ ;
বেফাঁস হলো !
নেটিজেনদের কুরুচি !
তুমি তো আর ফেসবুকে চিৎ হয়ে শোও নি যে বলাৎকারের ভয় !
গাড়লের কিম্ভূতকিমাকার ফর্দাফাই করোও নি যে ক্যালানোর ভয় ;

বাঁচা মরার কথা ছাড়ো , ওসব কারো বাপের সম্পত্তি নয় 
যে গলায় বকলেশ পড়িয়ে যখনি মনে করবে তখনি তোমাকে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যাবে .....;

চলো , চলো দেখি তোমার সার্টের কোণা , টেরিকাটা পোজগুলো আজকাল কতটা কেতাদুরস্ত হয়ে ঢাকতে পেরেছে বিগত পাপ যতো ;

তাই তো যেই না ঢোক গিলে বলতে গেছো ,
অন্য কারোও কথা 
অমনি সোহাগের ঠোঁট উল্টে কামড়ে দিলো ;
দশহাতের তীব্র নখে আঁচড়ে খেমচে রক্তাক্ত ; 
কী , হলো তো , ভালোমানুষের উপাধিতে কফ থুতুর বৃষ্টি ?

ভয় নেই । অপেক্ষা।
যা তোমার খোড়া ভিখিরির ; যা তোমার এ যাবতকালের 
একমাত্র অবলম্বন 
ভাঙা বাঁশের লাঠির ডগার মতোন 
তাকে, শুধু তাঁকে
নিয়েই ভিক্ষাপাত্র রেখে চলন্ত ট্রেনের দরজা খুলে দেখ 
   কী অনন্ত নির্মলতা 
      এখনোও তোমার ,
  শুধুই তোমার , আর কারো না ।


কোথা থেকে 
কোথায় যাই যে !
নিজেই বুঝি না । 

শুধু বুঝতে পারছি 
কিছুক্ষণ সরে গেছিলাম এই ডিকবাজির জীবন প্রবাহের বাইরে , তাই -----








১৪৬.
চারপাশে দেয়াল ।
দরজা আছে । জানালাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে একে একে । একটা দেয়াল খিক খিক করে । 
মুখ ঘুরিয়ে চোখটাকে রাখতে যাবো 
অমনি এক ঝাঁপটা ।
জল নয় জল নয় 
ছিটিয়ে যায় আরও
কিছু । 
একটা দুটো সব দেয়াল ই স্বভাব সারল্যে কায়দার অভাবে আজ 
আমার গলায় দশ হাত চালিয়ে দিয়েছে ।
রক্ত নেই । ঘাম নেই ।
সব শরীরের বাইরে ।
শরীরটাকে জড়িয়ে ময়ালের লেজে জড়িয়ে চিপসে যাচ্ছে । কতক্ষণ পরে নিঃশেষ হবে সেই 
অপেক্ষা শুধু একটি তৈলচিত্রের দৌলত আজ । শিল্পী বলেছেন না তিনি আর কতক্ষণ 
আমাকে রাখবেন 
অনিবার্যের হাতে ;


একটি বদ্ধ ঘর 
আর ছায়াদের ডিগবাজির ভেতর 
আমার চৈতন্যের 
আত্মধংস এঁকে তুলছেন আমার চিত্রকর । 
ভাষ্কর্য নয় । কারণ তাতে যতটুকু বাস্তবতা অতিবাস্তবতার প্রয়োজনীয় হয় 
তার বাইরে এই জাদুবাস্তবতার আলোড়ণ আজ আমি বন্দী !








১৪৭.
শীত রাতের অপেক্ষা
শেষ হলে 
উভয়ে আমরা খুঁজতে
চাই কিছুটা আগুন ;
কিছুটা উষ্ণতা কে জানতে না দিলেও 
অনেকটা নিরাশ্রয় 
সে সব মুখস্থ করে ।
নিরুপদ্রব জানলা পেলে হাওয়ায় খানিকটা চোখ মেলে ধরে যে
সেও তো অনিবার্য !

তাই বলে বলছি না 
কেউই আমরা যাবো না পুনরায় 
পুনরায়ের কাছে দুহাত মেলিয়ে ;

যাওয়া থাকবেই ।
যতোই ছবি 
না থাকুক । যতোই নিরাকার কে ঈর্ষাকাতর মনের বারান্দায় পোষ মানাও না 
সেই অনিবার্য তোমাকে সব প্রতিবন্ধকতার বাইরে 
এমন একটি মনের
জানলায় চিৎ করে 
ছুরি চালাবে যে
তুমি কুয়াশায় কুয়াশায় ভাসতে ভাসতে ছবির ঢেউ হয়ে তাকেই 
ঘিরে থাকবে , যে আঁজলা ইসত
বহমান তাই সেই অরূপ , যেখানে সকল প্রতিবন্ধকতার বাইরে 
চলে গেছে নতুন নতুন  স্নানের সকল ঋতুকাল ...... ;





 

১৪৮.
অসম্মানের মাত্রা বোধ নেই ।
নেই তো অনেক কিছুই ! 
তবু হয়ে উঠেছো কোন কায়দায় বেশ লকলকে 
দেখলেও টানাটানি লেগে যায় ;
অমানবিক মুখোশ খানা লুকিয়ে বেশ মানবিকতার নারীসুলভ হাঁটাহাঁটির বৈশিষ্ট্য টুকু 
ধার করে বেশ দুঃখি দুঃখি ভাব করে 
যেদিকে যেমন খুশি গেড়ে বসে যাও দেখি ! 
তা যাও।এই যাওয়া আসার ধারাপাত দোলা , এত দেখেছি যে , দেখে দেখে কন্ঠস্থ হয়ে গেছে ;
নিজেকে ছাই থেকে 
বেছে ফেলছি না কিন্তু 
মনে করো না কয়লায় ছাইয়ে , রাবিশে শুই নি , বালিয়াড়ি তে ডোবা মোষের পাশেও 
পড়ে থেকে মেখেছি অনেক কাদা ;
এসব সেরে সুরে 
ডান উরু বাঁ উরুর খাঁজে খাঁজে অনেক খুইয়ে ঠোঁটের মসৃনতা 
তারপর তিল তুলসি তামা হাতের কোষে তুলে নিয়ে 
সেই ভোর ভোর দাঁড়িয়েছিলাম এসে 
এই অববাহিকায় ---- 


আর কোনও উদ্দেশ্য  ছিলো না ,
তাও নিজেকেই পুনরায় হাবা ঠাওরাতে দিলাম  !







১৪৯.
এই যে ভাবনাদের দাসত্ব গঞ্জনা লাঞ্ছনায় 
উদ্বেলিত দিন কাটাই‌ 
সে কি শুধুই প্রকাশ লোভের কারণ 
কই 
নাতো !
কোনোদিনও প্রকাশ উৎকন্ঠায় কাটে নি তো দিন !
বরঞ্চ কোথাও বা হলেও সে রূপবতী
কুঁকড়েছি কেবলই
অত্যন্ত আড়ালে আড়ালে 
ঘটেছে সে টলমল দিন ;
তাও দাস হয়েই পড়ে আছি চরণখানি ধরে 
কীভাবে যে
কখন সব খেলা শেষ হবে !
নাকি শুরু ?
জানি না । মুক্তির নেশায় তবু সে এসে ছোঁয়ায় আঙুল 
ছুঁই আমিও ?
জানি না 
জানতে ইচ্ছাও করে না 
সময় পেরিয়ে যায় 
দাস হয়ে আছি 
পায়ে পড়ে আছি !

কই 
না তো , একবারও সারাদিনে ভাবি না তো 
তবু সে আসে ,
হাতের ছোঁয়ায় ছুঁইয়ে আঙুল চিৎকার শোনায় তাঁর


আমি শুনি না 
ছুঁয়ে থাকি শুধুই 


এই শুধু  অপরাধ !






১৫০.
নামতে নামতে অনেক নিচেয় নেমে 
নিঃশেষিত মুখের সারিতে তোমার সকল অনুপস্থিতি ।
যেন নিঃসঙ্গ একটি গাছের নেড়া ডালে প্রসস্ত বিষাদ ছেয়ে আছে ।

ভালোই হলো 
তাওতো যাওনি ! যাওয়ার নিয়মে তবু ;
অক্ষয় , অনির্বচনীয় এই উপস্থিতি , স্মরণাতীত ,ছেয়ে আছে আরো কত দূর অবধি 
সেইটুকু রোদ্দুর খুঁজতে খুঁজতে আজ আমি অনেক দূর অবধি মাঠের নিচু আকাশে শেষ ঠোঁট রেখে আসতে আসতে ভাবছিলাম , এই দুটি চোখে তোমার মৃত্যু নেই কেন ?

উপর্যুপরি এই উপস্থিতে সকল অনুপস্থিতির অনন্ত ছুঁয়ে এতটাই দীর্ঘ 
যার ওপারে কেবলই তার জন্মান্তর ঘটেই চলেছে ---- এতটা অবিশ্বাস কপটতা শেষ অঙ্কের হিসাব মেলাতে পারে নি যেন কিছুতেই , কোনোদিনও -----







১৫১.
ধীরে ধীরে একটি ছায়া তলদেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে জলজ রূপে ।
দৃশ্যত তাঁর উপস্থিতি ,
প্রাণস্পন্দন ছাড়া 
আর তো কিছু নয় !
তার ও আমার ,
তোমার ও তার ,
সে ও তাঁহারা
সকলেই ,‌ সকলেই 
দেখতে পায় কি চলমান সেই ছবিটুকু .....?
সে তার উপস্থিতি
না চিনলেও 
না চিনলেও বৃত্তাকার সেই সহনীয় অসহনীয়তা , 
ডুবসাঁতার চিৎসাঁতার চলতেই থাকে মুহুর্মুহু চোখের গভীরে ;

যাত্রাপথ আগলে কে আর বসে থাকে ;
ঘুরতে থাকে সকল অন্যমনষ্কতায় নিরন্তরের সেই সত্য তবুও। যা তাঁর অনিবার্য। যা তাহাদের । যা সে ও আমিকে ঘিরে ঘিরে
ফুরিয়ে ফেলে সকল শীতকাল । বসন্ত শীতের ভেতর হামা‌ দেয় যে অনুভবে ?
তাঁর হাত থেকে কান্নাদের রেহাই নেই যে, তা তার নীরব চাহুনিরাই জানে , আর কেউ নয় ।






No comments:

Post a Comment

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে

পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে দীপংকর রায়‌ উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস ১৬৩. একটিকেই চিনি, দুদিকে প্রসস্ত সকালের অন্ধকার যার... নৈঃশব্দ সেই ঘু...