বাংলাদেশে লেখা কবিতাগুচ্ছ
দীপংকর রায়
১.
তার কোনো নাম হয় না , একটাই পরিচয় , পথ ভিজিয়ে ঝরে পড়ে অগনিত
ধারায় আত্মহননের শেষ চিহ্নের স্বরূপ যে মত ; ---- ওই ধিক্কার ওঠে সভ্যতার অবিশ্বাস যেদিকে পরিচয় গোপন করে হাতের মুঠোয় ;
এই খুনিকে না চিনে চেন তার পরম্পরার চিবুক যদি , দেখবে শুধুই সিঁড়ি ভেঙে পড়ে আছে উপরের যাত্রী শূন্য খাঁচায় হাওয়া লেগে দুলে উঠছে কতকগুলি হীনমন্য করতালি যেন ; পাখি তো দূর আকাশে কদর্য বাঁকানো ঘাড়ের সন্তরণ ছাড়া আর তো কিছু না !
কাকে করেছিলে চুম্বন !
কাকে করেছিলে লালন বুকের সমস্তটা রক্ত চুঁইয়ে দিয়ে আঙুলের বিস্তারে !
জানো না । জানে না অনেক বোকাদের স্বভাব ভিমড়ি ; জানে সেই ---- যে ছদ্মবেশ টেনে খুলতে গিয়েই দেখলো কতকালের মল মূত্রের ভেতর মুখলুকিয়ে ছিলো প্রকৃত খুনি !
২.
নখের ডগায় ছটফট করছিলো কতগুলি ভুল সাঁতারুদের ঢেউ কাটা ডানার বিস্তার.... ;
নিচেয় উপরে সকল দিকেই ক্ষুধার্ত জলচরপ্রাণীদের বাস।
কোথায় যাবে সে !
অসহায় দুহাত পাততে যেয়েই দেখলো , খিদে আর খিদে ...! কোথাও চেনা -শুনো জানা -শুনো এমন কেউ নেই, কিছুই নেই ,
কাকে রেখে কোন দিকে সেই নখের বিস্তার এড়াবে সে ?
ছটফট করতে করতে
একবার নখ থেকে মুখে , মুখ থেকে নখে উল্টেপাল্টে , একটি রেখার ভেতর নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখা গেল শুধু তাকেই ----
যার হত্যা-লিপি লিখে চলেছে পথের ওই উন্মাদ পরিব্রাজক ......
৩.
যে হাত কোনোদিনও
বার করলে না শরীর থেকে । সেই হাতে এত কদর্যতা লাগালে কীভাবে !
মনে পড়ছিলো অন্নদা পালের সঙ্গে রাত জেগে কোন ছেলেবেলায় যেন দেখেছিলাম খড়-বিচালির ভেতর থেকে বার করে আনা মহিষাসুরের রক্তমাখা শরীরটা কিভাবে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিল সে !
সেই বিস্ময়ের বয়স বাড়লো না কোনোদিনও ; অথচ কখন কীভাবে যে শরীরের ভেতর থেকে আরো দুটি হাত অসহায় হতে হতে এত দৈন্য মেখে নিলো
নিরাশ্রয় হয়ে বুঝতেই পারলাম না যেন ;
তবুও এই বের হওয়া হাতের দিকে আজ সারাদিন চেয়ে রইলাম
অপলক --- কী যে অসহায় লাগতে লাগলো , বারবার মনে হলো এই হাতে কখন জড়িয়ে গেল এত কাদা পাক গু মুত বলতে পারো হে আমার সকল বিশ্বাসী
বন্ধুগন , বলতে পারো
লুকোনো এই হাত দুটিতে কখন আমি খুনি হয়ে গেলাম .....?
৪.
হে পরম পিতামহ
আমি সব আপনার হাতে তুলে দেবো বলেই কথা দিয়েছিলাম , প্রথম কেঁদেছিলাম যখন
ফেলে আসার মোহে....
সে সব আপনার জানা নেই তা তো নয়
আমার বিপর্যয়ের কারণ একটাই : আপনি সব দেখেও
জেনেও না জানার ভান করে আমার কাছ থেকে সবটুকু নিঃশেষ করে নিতে নিতেও অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন এক একটা ঝড়ের রাতে ....;
মজা আমি টের পাই না তা ভাববেন না
সব টের পাই যে তাও আপনারই দান যে, তাও তো অস্বীকার করিনি কখনো !
তাও আপনি আমার বংশ পরিচয়ের কথা স্মরণ করিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত.....;
বুঝি , বুঝি বলেই আমিও আপনার মজায় নামগোত্রহীন পথের রাতের ট্রেনে উঠে পরি নির্দিধায় এই ভেবেই ---- নিশ্চয়ই আশ্রয়হীন হতে হবে না কোথাও
সে যাক, এইবারের নেওয়া আপনার কেমন লাগলো সেটা বলেন ?
আমার তো মনে হয় ভালোই ;
আমারও বেশ ভালো লেগেছে ---- এই যে একটু একটু করে আমি আমার পুরোনো ঠিকানার কথা স্মরণ করতে করতে
একটার পর একটা পথ পাল্টে বাড়ি পাল্টে মুখের সারি পাল্টে আপনার অন্ধকারে আলো খুঁজতে খুঁজতে আরো দূর আলোঅন্ধকারে আপনাকে ডাকছি ---- এ... সে... গে.... ছি..... আ.... প..... নি ...... কো .... থা.....য়.......
৫.
প্রতিদিন
একটা করে কাঁটা খুলি
আর একটা করে গলায় বেঁধাই ।
এই মাছ লেজ নাড়াতে নাড়াতে সচ্ছ জলের ভেতর
পাঁক তুলে গোত্তা মেরে আমাকে আদিগন্ত ঘোরালেও স্বভাবে পরিবর্তন
নেই । বরঞ্চ মাছগন্ধে আঁশটে আকাশ খোঁজেই মসগুল আমি ---- বৃষ্টিরাত জানে শুধু এই বিভোর মুগ্ধতার অপর দিকে কিসের খোঁজ থাকে;
একবারও কি জানার চেষ্টা করেছি ,
কেন এত কাঁটা বিঁধিয়ে এমন সুখ উপলব্ধি করতে যাই !
অষুধ আছে । নিইও গোপনে ।
আবার বেঁধে।দেখতে পাই , কী অসাধারণ প্রশান্তিতে চেয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে আমার মুখটি জড়িয়ে এত মৃত মাছেরা ....!
ঝড়ের রাতে আবারও মাছ ধরতে বেরোই
সেই কবেকার ফেলে আসা পল্লীর পথে- ঘাটে- মাঠে--- বিলেন জলে রাবানী-ঘুনি হাতে একা একা ......
কে যেন আকাশ বাতাস ফাটিয়ে তুম্বশরীর বাঁকিয়ে
বিদ্যুৎ চিৎকারে জানান দেয় , কাঁটা আছে , মাছ আছে , সুস্বাদু ঠাট্টা তামাশায় ভরা সারসের গলা ----
৬.
আমাকে এমন নিভৃতি দেও
যখন এমন শ্রাবণ অন্ধকারে
তাঁর ফুটে ওঠার ভেতর নিস্পাপ টগরফুলের সকল ঊজ্জল্য অনুভব করতে পারি ;
চোখের ভেতরে ছিলো কাঁকর বিছানো পথ ...
বাইরে ছিলো নগরের অনেক ধুলো .....
আর এদের মাঝে আরো ডুবে আছে যারা সব মজা খালবিলে ডোবা-পুকুরের জল
কিম্বা পাট পচা তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে ম ম করা কত সব অলস মুহূর্ত , তারা যে কত দূরের পদ্মা-মেঘনা-আড়িয়াল খাঁ , তাদের সব চাঁদ ভাঙা দেদোল আকাশের কথা কী আর বলবো বলো ,
সেসব যেমন আছে তেমনই থাক ,
চলো , এখন যেদিকের বিস্ময় ভরা চোখে এমন রাতের টগরহাসিটি হৃদয়ে ছুঁড়ে দিল কত না ঠাট্টার হাসি ;
আহা , সে তোমায় কিভাবে বোঝাই তার উপস্থিতির ভেতর হাজারো সম্ভাবনার মৃত মুখ ,জীবিত !
না কি সে শুধু ফুল হয়ে পথে পথে ,পথের ধারে এই যে এত অবহেলিত- শ্রাবণ চোখের ঢেউ হয়ে গেল অজানা অচেনা নদী পেয়ে একাকী , তাকে আমি কোন গানে গেঁথে তুলি বল না আজ আর একবার; আমি তো তারই কাঁকর পথের ধুলোয় চলেছি হাওয়ায় হাওয়া মেখে এই যে নির্জন , বিষণ্ণ, গুরুত্বহীন ;
সত্যিই কি চোখের বাইরে এবং ভেতরের এই পার্থক্য আমি কাউকেই বোঝাতে পেরেছি ?!
শ্রাবনরাতের এমন বৃষ্টিসুখে কতকাল পরে আবার নির্ভার হলাম যেন , অন্ধকারের এই টগরফুলের গাছটার মতো আর কারো এমন শান্তি নেই যেন;
৭.
আমার গল্পে এমন কোনো চমক নেই
কিম্বা কামড়ে ধরা
ঠোঁটের বিষরোমন্থন
যাতে শিহরণে শিহরণে সে একটি ফুলেফলে গাছ হয়ে ঝড়ের রাতের উন্মাদ চিৎকার হয়ে যেতে পারে .......
এই সুখ ও শান্তি কোনোটাই নেই ---- তবু রয়েছে এমন কিছু
আকাশ খানিক
একপোচ বিকেলের
ঘষা মেঘের ঠাট্টা ;
যাতে সহজেই যে কেউ এক্কাদোক্কা চি কিত্ কিত্ দৌড় দৌড়তেই পারে - ই নিঃসন্দেহে ;
তরোয়াল বন্দুক রাইফেল ভেঙে যেতেই পারে , নিদেনপক্ষে এক একটা স্বাধীনতা যুদ্ধের দিন যেন .....
অন্তরীক্ষে....!
৮.
একজনের নিজস্বতায় নেই কোনো সন্ততি
নেই প্রিয় অপ্রিয়
আত্মীয় অনাত্মীয় ।
কেউ নেই ।
এতটাই স্বাধীন তাঁর চলাচল
এতটাই একার সে ধন
যাকে আড়ালে রেখেই সে বাঁচে ,
বাঁচায় অন্যকেও এইটুকুর দানে প্রতিদানে , সেখানে সময় সময়ের হাহাকার শোনে শুধু নিজের মতো ;
কারো জননে-যোনিতে লিঙ্গের উত্থান পতনে---- কিম্বা শ্রেণী বিভাজন
কোনোটাতেই সে দেয়না বাঁধা ওইটুকু শান্তি ;
তুমি কী ভাবো কুয়োর ব্যাঙ
কী জ্ঞানে কী বিভাজনে কী অস্ত্রে যাকেই কাটো ,যাকেই খন্ডিত করে তুলে দেও কাঠগড়ায় ; এই মূঢ়তা , বোধের জলাঞ্জলী, যে প্রতিহিংসায় ছোঁয়ালে হাজারো অগ্যতার বিষনখ কোনো এক বটবৃক্ষের মূলে , দেখেছ কি তাঁর রক্তঝড়া অসহায়তা কখনো ?!
দেখোনি । দেখার সেই চোখ অন্ধ আজ ---- মাদারী র দলে তুমিও জামা পড়া বানরবানরীর খেলাতে
লাফ কাটো ;
দূর থেকে দেখি শুধু
দূর থেকে কাছে আসে সেই মানুষি কখনো কখনো, যার হাতে সময়ের হিসাব নেই ---
চাঁদ কি তখন ঢলে যেয়েও আটকে গেছিল পশ্চিমের দেবদারু জঙ্গলে...... ?!
ছবি : কল্পোত্তম

No comments:
Post a Comment