পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে
দীপংকর রায়
উৎসর্গ : দীপ্তিশিখা দাস
৭০.
সব উল্টে যায় ----
যেভাবে হোঁচট খেয়ে
পড়ি পথের দিকে চেয়ে ;
কত আকাশের মাঝে গড়িয়ে গড়িয়ে ভাসে দেখি আমার কঙ্কাল ....;
অফলাইনে এভাবেই সকল প্রফাইল বিবর্ণ আজ---
পাল্টাতে পারি না ।
পাল্টে পাল্টে যেভাবে মোহনীয় হও ,
তার উল্টো পথে নিজেকে করি আরো বিবর্ণ ।
পথ , পথের দিকে চাইতে চাইতে কুকুরকুন্ডলী শোয় ;
আমি কী নিয়ে ফিরি ,কী নিয়ে করি
তাঁর ঘরের খোঁজ...?
তার অবহেলাই
তাঁর খোঁজে
এমন ঠিকানাবিহীন করলো আজ !
৭১.
আমার অসহায়তা কি খুব বড় ?
তার থেকেও এই যে মুখথুবড়ে পড়া মেঘরোদে ছুটছে যে সব দিকবেদিক শূন্যতারা ----
তার থেকেও আরো যেন কত অসহায়তার
অন্তরীক্ষে এলোমেলো সেই হাওয়াদের পথ .....
তাই তো জানি
এসবের ভেতর কত তুচ্ছ এই যে আমার
সকল না পারা ,
না পাওয়া জীবনের
কয়েকটুকরো মান-অপমানে নীল
হওয়া মুখটি ----;
দুপুর রোদে দু'পা প্রশস্ত করে , জিভ বার করে , যিনি শরীরে মাখছেন দোমাটি , তাঁর শম্ভুনিশম্ভু সংসার কথা ভাবতে ভাবতে যে পথ পেরোচ্ছিলাম একাকী ......
কে যেন পেছন থেকে ডেকে উঠলো বাবার গলায় ; না কি মায়ের কথা মনে পড়লো আজ একবার
এই আসন্ন অমাবস্যার ঘোরে ...!
কানতে পারলাম না ।
সেও যেন মা হয়ে মুহূর্তে হাত রাখলো
মাথায়---- ?
মনে পড়লো , এই তো
যে মুখটি আস্তে আস্তে
মিলিয়ে যাচ্ছে .....
নেহাতই চাওয়া পাওয়ার হিসাব মেলাতে , সেও কি আমিই ছিলাম ?
ছিল কি আমার ম্লান মুখ কিছুটা তার
কোলের ভেতর
মুখথুবড়ে পড়ে ?
দুটাকার ফড়ে উঠলো হেঁকে , একশো টাকার বেহিসাবে ?
আমি তো শূন্য , দিল খানিকটা গুটখা ঢেলে ----- বললো , ধার মেটেনি ---- এই ধার মিটিয়ে তবেই পরের
হিসেব ;
মনে পড়ছিল শ্মশান ঘাটের পাশে ডোমকন্যার জলজ্যান্ত হাসির কথা
খানিকটা ----
মনে পড়ছিল শিশুকন্যাটিকে কাঁধে করে যে পিতা মুখে আগুন দিল তার.....দিল নিথর দেহটি প্রবেশ করানোর আগে ; তার
এই হাহাকারের কথা
কে আর ঠিকঠাক বোঝে , তুমিই বলো না ?
পথ ভাঙছি , এই তো দুপুরের পথ একাকী
ছুটতে ছুটতে
কেউ কি তাড়া করলো
আজ আমায় ?
কে সে , আমার পেছনে পেছনে চলেছে ......?
৭২.
কত ভাবে
কত গোপনীয় অন্তরাল ভেঙে
সে যে নদী হয়ে যায়
কেন ......?
হতবাক হয়ে যাই ----
তুমি তো মাথা চুল্কিয়েই মরলে কেবল ;
তাই না দেখে
ব্রহ্মান্ডের সকল নকশারা উঠলো হেঁসে ---- বললো , খুঁজে পেলে না তো ?
খুঁজে পেলে না তো ,ওই বদ্ধ পাগলই
পায় আমায় খুঁজে ----কারণ , বস্তুর বাইরে যে যে রহস্যে তাঁর শরীরে আমার অন্তরাল ঢেউ খেলে ... তাকে দেখতে হলে তো ওই পাগলের কাঁধে চড়ে
এই বৈতরণী
পার হতে হবে ---
জানি , তা তুমি পারবে না বলেই
খুঁজে পাবে না সেই
অলৌকিকতা ---- ;
এই সব
হাবিজাবি চিবোতে চিবোতে যখন পথ
ভাঙছিলাম
মনে পড়লো ,ও হো ----- আজ তো পাওনা দেনার খাতা থেকে
মৃত মায়ের নামটা
খারিজ না করলেই
নয় ....।
দম বন্ধ করে
দম ছাড়তে ছাড়তে
তাঁর মুখটি দেখবো বলে আকাশের দিকে চাইলাম কয়েকবার ---- ওমা ! সমস্তটা জুড়ে তাঁর মুখটি দেখি লাল মেঘের ভেতর --- উঁকি দিয়েই যেন ডুবে গেল নিমেষে...
৭৩.
সকল মুখ আনন্দদের পেয়ে নদী হয়ে ঝিরঝিরে হাওয়ায় মেশে যখন , সেই বাতাস কথাদের দিকে চেয়ে একবার অন্তত
নতজানু হই ---- ভেতরের সকল মোহর গড়িয়ে দি সেই নর্তকীর পায় ----?
সেও যদি না নেয় ঘোর প্রলাপ , আপন প্রবাহের মজা খালে উজার করি সেই অর্ঘ ----- তাঁর দিকেই সকল যাত্রা পথ ----- তাতেই অলিখিত প্রলাপ আঁকি পুনরায় ; না না মন্ত্র নয় , নয় বিলাপ ---- তবু সেই ঘুরে ওঠাতেই ধরে রাখি সকল জলকল্লোল .....!
চেও না তির্যক আর , রক্তের অকথিত সম্মোহনে
ফিরে দেখো
ওই তো বারান্দা পেরিয়ে চলে গেল রাতের সকল কুয়াশারা একলা পায়ে ......
সে তার নদীকে
দুই পার ভেঙে পারলো না তবুও ছুঁতে
এই জন্মে যেন....;
বিশুদ্ধতার সকল , কোন কোনের আসন খোঁজে যে ,
বুঝতে পারি না কিছুতেই যেন ---;
৭৪.
এই মুগ্ধতা কি সত্যিই
পাওনার ?
কতকালের উচ্ছাসে মোড়া সে রক্তস্নান !
যে মুখটি রাতের বিছানায় পাঁচ আঙুল
কপালে রেখে আড়মোড় ভেঙেছিল ,
সেও সামনে এসে সব ধারণা পাল্টে দেয় ;
এমনই হয় বেলা পড়ে এলে
বারান্দায় সব বিকেল হামলে পড়ে ।
তখন ছায়াদের ঘিরে পাখিদের ডানায় ফেরার সকল ক্লান্তি
মেখে নেওয়া .... !
তার ভেতরেও
কত মুখ চাওয়াচায়ি
ঘিরে ধরে যে দুই হাঁটু জুড়ে ;
তাতেও অনেক নখের বিস্তার , অনেক
বড়ো হাসি নেই কোথাও
চেয়ে চেয়ে দেখা আছে ক্লান্তিহীন ----
সব যেন শীতের সন্ধ্যাবেলার মনখারাপ ;
ওহে বিরহ , তুমি বিরহীর না ?
ঘুরে শোও রক্তের ভেতর । স্নায়ুর !
আমি খুব ভালো করে
পরিতৃপ্ত ঘুমের পর
আর একবার ভালো করে কুলকুচি করে ফেলে দি আমার ঘুমের ভেতরে যত সব ভুল স্বপ্নের লালা- বিষ ছিলো ;-----
ওমা ,
সে যে কত দূর থেকে দিনের প্রথম আলোয় মুখ তুলে চায় ----
বিশুদ্ধতার সকল কোন কোনের আসন খোঁজে যে ,
বুঝতে পারি না কিছুতেই ----;
৭৫.
তাকে ভাবা মানে
রসায়নে মিশতে মিশতে ডুবতে থাকা ;
খানিকটা বাকলে মুখ ঢেকে ধ্যানস্থ হওয়ার
মতোন ।
যদিও ইদানিং
লন্ঠন ঝুলিয়ে সে আদল বদল করতে চাইছে যে তা বোঝা যায় ।
সে ভালো
ভালোই হলো
রাতের ঘোড়ারা বহুকাল সহিসবিহীন
ছোটেনি....;
রক্তের দুরন্ত গতিতে গেঁজলা ভেঙে ছোটে যেভাবে অনাদি কালের চোখেরা ....
মধ্যপথে যেতে যেতে যেভাবে দিকশূন্য হয় !
এসব সব অবচেতনে ভাঙতে ভাঙতে
যেখানে এসে আজ কিছুটা প্রশান্তিতে তুলেছিল মুখ স্নায়ুর গভীর , একে অন্যের ভেতর হাঁটু ভেঙে বসতে চেয়েছিল
যেভাবে একদিন ;
এর বেশি কিছু কি জীবনও চেয়েছিল ?
না , চাওয়ার অধিকার জানাতে উঁকি দিয়েছিল তাঁহার সত্যে ?
ওই তো
কত প্রশান্তির হাওয়ায় গড়িয়ে গড়িয়ে
ওই ফসলের ক্ষেতে অবুঝ ফড়িংটার কী হাল !
কই , কেউ এই সব পোকামাকড়ের জীবনের কোনো হিসাব রাখেনি তো !
নাকি কেউ কারো অপ্রয়োজনে মাখামাখি পড়ে থাকা
শীতের নিয়রে
সেই সব ক্ষেতের দিকে
কখনো পেছন ফিরে
একবারও কি চায় ?!
৭৬.
ঘুরতে ঘুরতে এতটাই ঘুরে গেছে ছায়া সমৃদ্ধ;
কোন দিক থেকে তাতে আবৃত হবো ?
ভাবতে ভাবতে আজ তাকে পাঠালাম আমার অনেক পরাজিত হাতের আঁকিবুঁকি । সেও হাত উল্টে হাত নয়
হাতের ছায়ায় মেলে ধরলো মুহূর্তের অনেক কুয়াশা মোড়া খাজুরাহো ;
আমি কি পোড়া মাটির ভাষ্কর্য বুঝি !
না বুঝি পাথর খোদাই মৈথুন রূপ !
কিছুই দেখিনি তো !
দেখেছি জীবন সমৃদ্ধ সমর্পণে যে জীবন পূর্ণতা পায় ;
পথে পথে ঢেউ গুনি ।
বেঁকতে বেঁকতে পথ উল্টাই শরীরে ।
তুমি এসবের কিছুই বুঝবে না তো !
জানতে জানতেই জীবন একটি প্যাঁচার চোখের নিরিখে হারায়--- হারিয়ে যায় অন্ধকার রাতের তারায় কত সমৃদ্ধ অসমৃদ্ধ ঘুম চোখ যে!
হায়, ফুরায়
সকলই ফুরায়
একটি কুয়াশা ভরা মুখে !
যেতে যেতে যেমনটা দেখে কেউ কেউ
সকলেই না ।
ছবি : কল্পোত্তম

No comments:
Post a Comment